নওগাঁর আত্রাইয়ের এক হুজুরের কাছ থেকে পানিপড়া নেওয়ার আশায় দিনাজপুরের ফুলবাড়ী রেলস্টেশনে নারী-পুরুষের ভিড় জমেছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল থেকে প্ল্যাটফর্ম ও আশপাশের এলাকায় সব বয়সী মানুষের এই সমাগমে নিয়মিত ট্রেনযাত্রীরা চলাচল ও অপেক্ষায় ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম উপচে পড়েছে মানুষের ভিড়ে। কেউ নিজের রোগমুক্তির আশায়, কেউ আবার স্বজনের জন্য পানিপড়া সংগ্রহ করতে ট্রেনের অপেক্ষায় আছেন। অনেকে দূরদূরান্ত থেকে পরিচিতজনদের সঙ্গে এসেছেন। ফলে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা সাধারণ যাত্রীদেরও ভিড়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, আত্রাইয়ের ওই হুজুরের পানিপড়া নিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী-পুরুষ ফুলবাড়ী স্টেশনে এসে ট্রেনে চড়ে আত্রাই যাচ্ছেন। এত মানুষ কেন ও কী উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে কয়েকজন বলেছেন, রোগমুক্তির কামনায় তাঁরা যাচ্ছেন। তাঁরা শুনেছেন, ওই হুজুরের পানিপড়া খেলে সব রোগ থেকে মুক্তি মিলছে।
আমবাড়ী এলাকার ক্যানসারে আক্রান্ত শফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি শুনেছেন পানিপড়া খেলে সব রোগ সেরে যাচ্ছে। ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে তাঁর প্রায় সব অর্থসম্পদ শেষ হওয়ার পথে। তাই শেষ ভরসা হিসেবে তিনি পানিপড়া নিতে এসেছেন।
আদিবাসী গৃহবধূ রুপালী হাঁসদা জানান, চার বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়েছে, কিন্তু সন্তান হয়নি। স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে তাই হুজুরের কাছে পানিপড়া নিতে এসেছেন। তাঁদের বিশ্বাস, পানিপড়া খেলে সন্তান হবে।
ভিড়ের কারণে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা বলেছেন নূর ইসলাম নামের এক ট্রেনযাত্রী। তাঁর ভাষ্য, স্টেশনে এসে দেখেন প্ল্যাটফর্মে অনেক মানুষ। এতে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা কঠিন। বিশেষ করে ট্রেন আসার সময় ওঠানামায় যাত্রীদের ভোগান্তি হবে। তিনি স্টেশন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, অতিরিক্ত ভিড় হলে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও চলাচলে সমস্যা হতে পারে, তাই প্ল্যাটফর্মে শৃঙ্খলা বজায় রাখা দরকার।
ফুলবাড়ী রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার আনন্দ চক্রবর্তী বলেন, মানুষের এই সমাগম তাঁদের নজরে এসেছে। কয়েক দিন ধরেই এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। তাঁদের বেশির ভাগই আত্রাইয়ের এক হুজুরের কাছে পানিপড়া নিতে যাচ্ছেন বলে কয়েকজন তাঁকে জানিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, ফুলবাড়ী থেকে ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহীমুখী সব ট্রেনেই আত্রাইয়ের হুজুরের কাছে যেতে ইচ্ছুক বিপুলসংখ্যক মানুষ উঠছেন। যেসব ট্রেন আত্রাই স্টেশনে থামে না, সেসব ট্রেনের যাত্রীরা সান্তাহার বা নাটোরে নেমে বাস ও সিএনজিতে করে আত্রাই যাচ্ছেন। যাত্রীদের স্বাভাবিক ওঠানামা ও চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান স্টেশন মাস্টার।
ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে, গুরুতর রোগে আক্রান্ত বা দীর্ঘদিন সন্তানহীন অনেক মানুষ চিকিৎসার খরচ ও আশাহীনতার মধ্যে বিকল্প বিশ্বাসের দিকে ঝুঁকছেন। তবে পানিপড়া খেলে ক্যানসারের মতো রোগ সারে বা সন্তান হয়, এর কোনো চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ ও যথাযথ চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াই নিরাপদ পথ। অন্যদিকে স্টেশনের মতো ব্যস্ত গণপরিবহন এলাকায় এত মানুষের ভিড় নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি করে। তাই রেল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারি জরুরি। এখন দেখার বিষয়, ভিড় আরও বাড়ে কি না এবং কর্তৃপক্ষ কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেয়।

