আদালতের রায়ে “খালাস” শব্দটা শোনার পর মানুষ ভাবে যন্ত্রণার সেখানেই সমাপ্তি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন নিশ্চয় অনেকে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই যে বছরগুলো গেল, সম্মান গেল, টাকা গেল, উকিলের খরচের হিসাব — এর দাম কে দেবে? আইন কি আদৌ কিছু বলে এই নিয়ে? সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ। তবে শর্ত আছে। আর বাস্তবতা বলছে, পথটা মোটেও সহজ নয়।
ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারায় সরাসরি প্রতিকার দেয়া হয়েছে। এই ধারায় অভিযোগ বা এজাহারের ভিত্তিতে করা মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট যদি অভিযুক্তকে খালাস বা অব্যাহতি দেন এবং একইসঙ্গে মনে করেন যে অভিযোগ আনার পেছনে কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল না, তাহলে তিনি বাদী বা তথ্যদাতাকে কারণ দর্শাতে বলতে পারেন কেন তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। বাদী উপস্থিত থাকলে ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিকভাবে তাকে কারণ দর্শাতে বলতে পারেন, আর অনুপস্থিত থাকলে সমন জারি করে হাজির করাতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধারার অধীনে ক্ষতিপূরণ দেওয়া মানেই কিন্তু অভিযোগকারী দেওয়ানি বা ফৌজদারি দায় থেকে মুক্তি পেয়ে যান না। বরং এই টাকাটা পরে অন্য মামলায় নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ থেকে বাদ যায়।
দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলা দায়েরের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে — অর্থাৎ এটি শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবেও গণ্য হয়।
বিশেষ আইনগুলোতে এই সুরক্ষা আরও স্পষ্ট। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৭(৩) ধারায় বলা হয়েছে, রায় দেয়ার সময় আদালতের কাছে মনে হয় যে, অভিযোগ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক ছিল, তাহলে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগকারীকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুকূলে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারে। এছাড়া এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২-এ, অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়ের করলে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ও জীববৈচিত্র্য আইনের মতো আরও কিছু বিশেষ আইনেও মিথ্যা মামলার জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি ও জরিমানার কথা বলা আছে।
আন্তর্জাতিক আইনে প্রতিকার
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR)-এর একটি অঙ্গীকারবদ্ধ রাষ্ট্র। এই সনদের ৯(৫) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে, অবৈধ গ্রেপ্তার বা আটকাদেশের শিকার যে কোনো ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার একটি বলবৎযোগ্য অধিকার থাকবে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দেশীয় আইনে আটকাদেশ বৈধ হলেও যদি তা অনুচ্ছেদ ৯-এর পরিপন্থী হয়, তাহলেও এই ক্ষতিপূরণের অধিকার প্রযোজ্য হবে। এছাড়া জাতিসংঘের “যেকোনো ধরনের আটক বা কারাবাসের অধীনে থাকা ব্যক্তিদের সুরক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা” (১৯৮৮)-র ৩৫ নম্বর নীতিতেও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার কাজ বা অবহেলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদে, ৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই অনুচ্ছেদের বিধান লঙ্ঘন করে গ্রেপ্তার বা আটকের শিকার যেকোনো ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার একটি বলবৎযোগ্য অধিকার থাকবে।
গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায়
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রুদুল শাহ বনাম বিহার রাজ্য, 1983 AIR 1086 মামলায় এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এই মামলায় রুদুল শাহ স্ত্রী হত্যার অভিযোগে খালাস পাওয়ার পরও দীর্ঘ চৌদ্দ বছর কারাগারে বন্দি ছিলেন। মুক্তির পর তিনি রিট করলেন, চাইলেন ক্ষতিপূরণ আর রাষ্ট্রীয় খরচে চিকিৎসা।
আদালত রাষ্ট্রের এই আচরণকে সম্পূর্ণ বেআইনি আর নিষ্ঠুর বলল, আর ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিল। এই একটি রায়ই দক্ষিণ এশিয়ায় “বেআইনি আটকের জন্য সাংবিধানিক ক্ষতিপূরণ”-এর ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাদ্রাজ হাইকোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়ে এম. আবুবকর এবং অন্যান্য বনাম আব্দুল করিম (M. Abubaker & Ors. v. Abdul Kareem) বিচারক স্পষ্ট করে দিয়েছেন, শুধু খালাস পাওয়াই যথেষ্ট নয়, বাদীকে প্রমাণ করতে হয় যে মামলাটি কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই এবং বিদ্বেষপ্রসূত উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, এবং এতে বাদী প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যাকে প্রমাণভার বা Burden of Proof বলা হয়।
কাগজে–কলমে অধিকার কিন্ত বাস্তবে বাধা
আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, বিধান থাকলেও এর প্রয়োগ খুবই সীমিত। কারণ, শুধু খালাস পাওয়াটাই যথেষ্ট প্রমাণ নয়। আদালতে আলাদাভাবে দেখাতে হয় যে অভিযোগ সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া। ফলে বাস্তবে মিথ্যা মামলার শিকার অনেকেই খালাস পাওয়ার পরও নতুন করে মামলা লড়ার শক্তি বা সামর্থ্য জোগাড় করতে পারেন না। দেখা যায় অভিযোগকারীরা প্রায় বিনা মূল্যেই পার পেয়ে যান।

