বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে দীর্ঘদিন ধরে মূলত বন অধিদপ্তর ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই দেখা হয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমি ও আবাসস্থল সংকোচন, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য, মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত, নগরায়ণ এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পের চাপ-সব মিলিয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এখন আর কেবল বন বিভাগের একটি বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন নীতির অংশ।
এই বাস্তবতা সামনে রেখে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে একটি স্বাধীন ও বিশেষায়িত জাতীয় কমিশন গঠনের প্রস্তাব সামনে এসেছে সুধীজন ও বন্যপ্রাণী গবেষক দের নিকট হতে।
এসব প্রস্তাব বিবেচনায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণ, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়নের মূল্যায়ন এই চারটি কাজকে একই প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে কেন্দ্রীভূত না রেখে আলাদা করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সমস্যাটা কোথায়?
বর্তমান ব্যবস্থায় নীতি প্রণয়ন, ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের মধ্যে দায়িত্বের ওভারল্যাপ রয়েছে এমনটাই মতামতটির অন্যতম প্রধান পর্যবেক্ষণ। এর ফলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে।
এখানেই কমিশনের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় কমিশন মাঠে গিয়ে বন বা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা করবে না। বরং তার কাজ হবে জাতীয় নীতি তৈরি, বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড নির্ধারণ, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হচ্ছে তা স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা।
অন্যদিকে বন অধিদপ্তর ও বন্যপ্রাণী উইং থাকবে বাস্তবায়নের দায়িত্বে।
অর্থাৎ কাঠামোটি অনেকটা এমন:
কমিশন নীতি নির্ধারণ করবে → বাস্তবায়নকারী সংস্থা তা মাঠে প্রয়োগ করবে → কমিশন ফলাফল মূল্যায়ন করবে।
এই দায়িত্ব বিভাজনই প্রস্তাবটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কেন আলাদা কমিশনের প্রয়োজন হতে পারে?
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এখন হাতি, বাঘ বা হরিণ রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি হাতির করিডোর রক্ষা করতে হলে সেখানে সড়ক, রেলপথ, বসতি, কৃষিজমি, ভূমি ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ -সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
একইভাবে কোনো জলাভূমি বা বনাঞ্চল রক্ষার প্রশ্নে শুধু বন বিভাগের সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়। ভূমি ব্যবহার, কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, স্থানীয় সরকার এবং জলবায়ু নীতির সঙ্গেও সেটির সম্পর্ক রয়েছে।
ফলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে যদি সত্যিই জাতীয় নীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একটি স্বাধীন, বৈজ্ঞানিক এবং আন্তঃখাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কমিশন হলে সবচেয়ে বড় সুবিধা কী?
প্রস্তাবিত কমিশনের সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুবিধা হলো দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার সুযোগ তৈরি করা।
সরকার পরিবর্তন হতে পারে, প্রশাসনিক অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হতে পারে, প্রকল্পের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ফলাফল সাধারণত কয়েক মাস বা কয়েক বছরে দৃশ্যমান হয় না।
তাই ১০ থেকে ২০ বছরের জাতীয় বন্যপ্রাণী কৌশল, বিপন্ন প্রজাতির তালিকা, বন্যপ্রাণী করিডোর, সংরক্ষিত এলাকার কার্যকারিতা এবং মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাতের মতো বিষয়ে ধারাবাহিক নীতি প্রয়োজন। প্রস্তাবিত কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে এমন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।
তবে কমিশন করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশে নতুন কমিশন বা কর্তৃপক্ষ গঠনের ইতিহাস খুব সুখকর নয়। নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি হলেই যদি পুরোনো দায়িত্বের ওপর আরেকটি প্রশাসনিক স্তর যোগ হয়, তাহলে সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে সমন্বয়হীনতা আরও বাড়তে পারে।
একটি কমিশন যদি নীতি নির্ধারণ করে, মন্ত্রণালয় অন্য সিদ্ধান্ত নেয়, বন অধিদপ্তর মাঠে ভিন্নভাবে কাজ করে এবং স্থানীয় প্রশাসন আলাদা সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে কমিশন শেষ পর্যন্ত আরেকটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
তাই কমিশনের নামের চেয়ে তার স্বাধীনতা, ক্ষমতা ও জবাবদিহির কাঠামো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়োগব্যবস্থাই হতে পারে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
প্রস্তাবিত কাঠামোয় নয় সদস্যের একটি কমিশনের কথা বলা হয়েছে। সেখানে বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞান, সংরক্ষণ, বন ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ আইন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও জনপ্রশাসনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
এটি বাস্তবায়ন করতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ কমিশনের চেয়ারম্যান বা সদস্যরা যদি রাজনৈতিক আনুগত্য, প্রশাসনিক সুবিধা বা কোনো নির্দিষ্ট স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবের ভিত্তিতে নিয়োগ পান, তাহলে ‘স্বাধীন কমিশন’ নামটি অর্থহীন হয়ে পড়বে।
প্রস্তাবটিতে তাই সরাসরি কোনো মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর হাতে নিয়োগের ক্ষমতা না রেখে একটি বিশেষ বাছাই কমিটির মাধ্যমে কমিশনার নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। পাঁচ বছরের মেয়াদ এবং নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া অপসারণ না করার বিষয়টিও প্রস্তাবিত কাঠামোর অংশ।
বন অধিদপ্তরের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে?
এটি সম্ভবত পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা।প্রস্তাবটি বন অধিদপ্তরকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলছে না। বরং বন অধিদপ্তর ও বন্যপ্রাণী উইংকে মাঠপর্যায়ের প্রধান বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে রাখার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ কমিশন বলবে কী করতে হবে এবং কেন করতে হবে?
বন অধিদপ্তর বলবে যে মাঠে কীভাবে তা করা হবে।আর কমিশন পরে মূল্যায়ন করবে কাজটি ঠিকমতো হলো কি না।
এই মডেল কার্যকর হলে নীতি প্রণয়নকারী ও বাস্তবায়নকারী একই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
জনগণের অংশগ্রহণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সফলতা অর্জন করা কঠিন।
বিশেষ করে হাতি-মানুষ সংঘাতের মতো ঘটনায় শুধু বন্যপ্রাণী রক্ষার কথা বললে হবে না; ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, বননির্ভর জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সংরক্ষণ সংস্থাকে নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে সংরক্ষণকে ‘বন বিভাগের কাজ’ থেকে বের করে ‘সমাজের সম্মিলিত দায়িত্বে’ পরিণত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
উন্নয়ন বনাম সংরক্ষণ – কমিশনের সবচেয়ে বড় ভূমিকা এখানেই
বাংলাদেশের বাস্তবতায় উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ করে বন্যপ্রাণী রক্ষা করা সম্ভব নয়। আবার উন্নয়নের নামে গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ধ্বংস করাও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
সড়ক, রেল, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ প্রকল্প কিংবা বন্দর-যেকোনো বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, চলাচলের করিডোর এবং প্রজননক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত কমিশন এসব ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও মানদণ্ড নির্ধারণ করতে পারে। এতে উন্নয়ন ও পরিবেশের সংঘাতকে রাজনৈতিক বা আবেগনির্ভর বিতর্কের পরিবর্তে তথ্য ও বিজ্ঞানের ভিত্তিতে বিচার করার সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থায়ন ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ
স্বাধীন কমিশনের জন্য আলাদা বাজেটের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অর্থের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ তহবিল, গবেষণা অনুদান, CSR এবং জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ তহবিলের মতো সম্ভাব্য অর্থায়নের কথাও মতামতটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি সতর্কতার জায়গা আছে।
আন্তর্জাতিক বা বেসরকারি অর্থায়ন যদি কমিশনের নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, তাহলে স্বাধীনতার জায়গাটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাই অর্থায়নের উৎসের পাশাপাশি অর্থের ব্যবহার ও স্বার্থের সংঘাত প্রকাশের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা থাকা দরকার।
জাতীয় সংসদের কাছেও জবাবদিহি দরকার
একটি স্বাধীন কমিশন মানে জবাবদিহিহীন প্রতিষ্ঠান নয়।
বরং প্রস্তাবিত কাঠামোয় প্রতি বছর বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীর অবস্থা নিয়ে একটি জাতীয় প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সেটি জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে উপস্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
এটি বাস্তবায়ন করা গেলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সাফল্য বা ব্যর্থতা আর কেবল দপ্তরের অভ্যন্তরীণ নথিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন কি না তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা কেমন প্রতিষ্ঠান চাই?
যদি নতুন কমিশন কেবল নতুন পদ, নতুন অফিস, নতুন বাজেট এবং নতুন আমলাতান্ত্রিক স্তর তৈরি করে, তাহলে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
কিন্তু যদি এটি সত্যিই স্বাধীনভাবে বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতি নির্ধারণ করে, উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করে, বন অধিদপ্তরের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করে এবং সরকারকে নিজের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে বাধ্য করে তাহলে এটি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী শাসনব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ, স্বাধীন সচিবালয়, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং কার্যকর জবাবদিহি।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে যদি সত্যিই জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে শুধু বাঘ-হাতি-হরিণ রক্ষার প্রকল্প যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো, যেখানে উন্নয়ন, মানুষের স্বার্থ এবং প্রকৃতির অস্তিত্বকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে একই নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সেই জায়গা থেকেই প্রস্তাবিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী কমিশনের ধারণাটি আলোচনার দাবি রাখে।

