২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে সরকারের করবহির্ভূত রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে। এপ্রিল-জুন সময়ে এ খাতে সরকারের আয় হয়েছে ১৮ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। এক প্রান্তিকের ব্যবধানে এই আয় বেড়েছে ১৯৫ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সঙ্গে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন সময়ের তুলনায়ও প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯৪ দশমিক ২ শতাংশ।
রাজস্ব আদায়ের এই চিত্র সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির পেছনে যে উৎস সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে, সেটিই ভবিষ্যতের জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ শেষ প্রান্তিকে করবহির্ভূত রাজস্বের অর্ধেকের বেশি এসেছে লভ্যাংশ থেকে। ফলে এই আয় বৃদ্ধি সরকারের নিয়মিত রাজস্ব সক্ষমতার উন্নতি, নাকি সাময়িক কিছু বড় প্রাপ্তির ফল—তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে করবহির্ভূত রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৬ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা। তিন মাস পর এপ্রিল-জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকায়। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে অর্থাৎ এপ্রিল-জুনে এই খাতে সরকারের আয় ছিল ৬ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা।
সর্বশেষ প্রান্তিকের এই বড় প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল লভ্যাংশ আয়। এপ্রিল-জুন সময়ে শুধু লভ্যাংশ থেকেই সরকার পেয়েছে ১০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট করবহির্ভূত রাজস্বের ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ এসেছে এই একটি উৎস থেকে।
এ ছাড়া সুদ থেকে সরকারের আয় হয়েছে ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকা, যা মোট করবহির্ভূত রাজস্বের ১১ শতাংশ। প্রশাসনিক ফি থেকে এসেছে ১ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা বা ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। পাশাপাশি অ-আর্থিক সম্পদ বিক্রি থেকে ১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, ভাড়া ও অংশীদারি থেকে ৩৯১ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ২ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা আয় হয়েছে।
অর্থাৎ শেষ প্রান্তিকে সরকারের করবহির্ভূত রাজস্ব বৃদ্ধির পেছনে নিয়মিত ছোট ছোট উৎসের চেয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ, সুদ আয় এবং প্রশাসনিক ফি বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লভ্যাংশ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়া ইতিবাচক হলেও এটিকে দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব শক্তির সূচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা এবং সেখান থেকে পাওয়া লভ্যাংশ প্রতিবছর একই পর্যায়ে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, করবহির্ভূত রাজস্বে এই প্রবৃদ্ধি অবশ্যই উৎসাহজনক। তবে এর মাধ্যমে সরকারের স্থায়ী রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, লভ্যাংশ ও অন্যান্য অনিয়মিত উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিয়মিত কর আদায় বাড়ানো এবং রাজস্বের ভিত্তি আরও বিস্তৃত করা জরুরি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের করবহির্ভূত রাজস্ব আদায়ের বার্ষিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ১ শতাংশ। একই অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮১ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
এদিকে করবহির্ভূত রাজস্বের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বাইরে সংগৃহীত কর রাজস্বেও শেষ প্রান্তিকে বৃদ্ধি দেখা গেছে। এপ্রিল-জুন সময়ে এই খাতে আদায় হয়েছে ২০ বিলিয়ন টাকার বেশি। এর আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন টাকা। ফলে এক প্রান্তিকের ব্যবধানে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বাইরে সংগৃহীত করের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে স্ট্যাম্প শুল্ক থেকে। এপ্রিল-জুন সময়ে স্ট্যাম্প শুল্ক বাবদ আয় হয়েছে ১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা, যা মোট এনবিআর-বহির্ভূত কর রাজস্বের ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ছাড়া পণ্য ব্যবহারের ওপর কর থেকে এসেছে ৫ দশমিক ০২ বিলিয়ন টাকা এবং মাদক ও মদ শুল্ক থেকে এসেছে ৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
রাজস্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু বড় কোনো এককালীন উৎসের ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কর দেওয়ার সংস্কৃতি বৃদ্ধি, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং নতুন আয় উৎস তৈরির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শেষ প্রান্তিকে করবহির্ভূত রাজস্বে প্রায় তিন গুণ প্রবৃদ্ধি সরকারের জন্য সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ যেহেতু লভ্যাংশনির্ভর, তাই এটিকে স্থায়ী সাফল্য হিসেবে দেখার আগে আরও সতর্ক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই সাময়িক উল্লম্ফনকে কীভাবে নিয়মিত ও টেকসই রাজস্ব সক্ষমতায় রূপ দেওয়া যায়।
কারণ একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য শুধু আয় বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এমন রাজস্ব কাঠামো তৈরি করা, যা নিয়মিত, নির্ভরযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তি দিতে পারে।

