দেশের উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণে আবারও বাড়ছে ব্যয়। শুরুতে যে প্রকল্পের জন্য ৫ হাজার ২০৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল, সংশোধনের পর সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১২ হাজার ২৮৬ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ এক লাফে প্রকল্প ব্যয় বাড়ছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা, যা মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১২৪ শতাংশ বেশি।
রেল যোগাযোগ উন্নয়নের মাধ্যমে বগুড়া, সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হয়েছিল এই প্রকল্প। তবে অনুমোদনের কয়েক বছর পরও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এর ফলে সময় বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে ব্যয়ের চাপও।
পরিকল্পনা কমিশন ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সংশোধিত প্রকল্পটি আগামীকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। একই সভায় আরও বেশ কয়েকটি নতুন ও চলমান প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহিদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণের প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভারতের ঋণ সহায়তা হিসেবে ৩ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা এবং সরকারি অর্থায়ন হিসেবে ২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু তো দূরের কথা, ভূমি অধিগ্রহণের কাজও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে প্রথমে এক বছর এবং পরে আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর বিশেষ সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৫ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে নির্ধারিত সময় শেষ হলেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি খুব বেশি এগোয়নি। বর্তমানে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২৮ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৪১ শতাংশ।বাকি কাজ শেষ করতে নতুন করে সময় বাড়িয়ে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পের শুরুতে ভারতের অর্থায়নের কথা থাকলেও পরে সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হয়। ২০২৫ সালের ৫ মার্চ বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় অর্থায়ন থেকে সরে এসে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংককে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্ধারণ করে।
সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে এআইআইবির ঋণ ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। আর সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা।
রেলপথ মন্ত্রণালয় গত জুন মাসে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। সেখানে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। পরে যাচাই-বাছাই শেষে কিছু খাতে ব্যয় কমানো হয়েছে।
প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিভিন্ন নতুন খাত যুক্ত হওয়া এবং কিছু খাতে ব্যয় বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে।
সংশোধিত প্রস্তাবে শুধু পরামর্শক খাতেই ব্যয় বাড়িয়ে ২৩১ কোটি ৭১ লাখ টাকা করা হয়েছে। অথচ শুরুতে এই খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া প্রকল্পের যানবাহন কেনার ক্ষেত্রেও ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে দুটি জিপ গাড়ি, একটি ডাবল কেবিন পিকআপ এবং চারটি মোটরসাইকেলের জন্য ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল।
সংশোধিত প্রস্তাবে ১৩টি যানবাহন কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় এসব অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে আপত্তি জানানো হয়। পর্যালোচনার পর প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথে নতুন করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার মূল ডুয়েলগেজ রেললাইন এবং ৩৩ দশমিক ২৫ কিলোমিটার লুপলাইন নির্মাণ করা হবে।
এ ছাড়া করতোয়া নদীর ওপর ২৪৬ মিটার এবং ইছামতী নদীর ওপর ২০৫ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি আরও ১২১টি ছোট-বড় সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ওপর ১৭৩ মিটার এবং বগুড়া-নাটোর মহাসড়কের ওপর ১ হাজার ৩৩৬ মিটার দীর্ঘ সড়ক ওভারপাস নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় আটটি নতুন রেলস্টেশন নির্মাণ করা হবে। এগুলো হলো—সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, সনকা, শেরপুর, আরিয়াবাজার ও রানীরহাট।এ ছাড়া বগুড়া, কাহালু এবং সদানন্দপুর স্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আবু জাফর মিয়া জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত মূলত ভূমি অধিগ্রহণের কাজ হয়েছে। প্রকল্পের বাস্তব নির্মাণকাজ তেমন এগোয়নি।
তিনি বলেন, প্রকল্প গ্রহণের সময় পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। একটি সাধারণ সমীক্ষার ভিত্তিতে নকশা তৈরি করা হয়েছিল। পরে বিস্তারিত পর্যালোচনায় কিছু নতুন কাজ যুক্ত করতে হয়েছে, যার কারণে ব্যয় বেড়েছে।এই বক্তব্য উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কাজ শেষ না হলে বারবার ব্যয় বাড়ে। এতে জনগণের অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।তার মতে, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেল প্রকল্পটি জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে এর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ চালু হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার যোগাযোগ আরও সহজ হবে। কৃষিপণ্য পরিবহন, যাত্রী চলাচল এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে প্রকল্পটির মূল চ্যালেঞ্জ এখন দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। কারণ দীর্ঘসূত্রতা শুধু সময় বাড়ায় না, একই সঙ্গে বাড়িয়ে দেয় সরকারি ব্যয়ের বোঝাও।
উন্নয়ন প্রকল্পে সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবসম্মত ব্যয় নির্ধারণ এবং সময়মতো কাজ শেষ করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়ার আগেই প্রকল্পের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

