বিদেশে কাজের সুযোগ বাড়াতে ভাষাগত দক্ষতা অর্জনে প্রবাসীদের জন্য নতুন একটি ঋণ কর্মসূচি চালু করছে সরকার। এই উদ্যোগের আওতায় প্রবাসগামী কর্মীরা প্রয়োজনীয় বিদেশি ভাষা শেখার জন্য সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। এই ঋণ কার্যকর করতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের হাতে এক হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল তুলে দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে নয় শতাংশ।
সাম্প্রতিক অর্থবছরে প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যার অঙ্ক পঁয়ত্রিশ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। তবে অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ, রেমিট্যান্স পাঠানো এই বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর একটি বড় অংশই মূলত অদক্ষ শ্রমিক। তাঁদের মতে, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী ভাষা শেখানোই দক্ষতা বৃদ্ধির একটি কার্যকর পথ হতে পারে।
বিশেষ করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো তুলনামূলক নতুন শ্রমবাজারে কাজের সুযোগ পেতে সেই দেশগুলোর ভাষা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নতুন এই ঋণ কর্মসূচির আওতায় বিদেশে পৌঁছানোর পরও ভাষা শেখার খরচ মেটাতে এই সুবিধা কাজে লাগানো যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করেছে, যার আওতায় এক হাজার কোটি টাকার এই তহবিল সরবরাহ করা হবে। এই অর্থ থেকে বিদেশগামী কর্মীদের গন্তব্য দেশের প্রাথমিক ভাষা শেখাতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
তবে এই ঋণের পরিমাণ এবং তার প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। প্রবাসী বিষয়ক একটি সংগঠনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার মতে, শুধুমাত্র ভাষা শেখার জন্য দশ লাখ টাকার মতো বড় অঙ্কের প্রয়োজন আছে কি না, তা পুনর্বিবেচনা করা দরকার। তাঁর আশঙ্কা, ঋণের এত উচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হলে বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ নেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই আশঙ্কা মোকাবিলায় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিতে কঠোর কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, জাপানে যাওয়ার ক্ষেত্রে জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ মিলবে, কিন্তু এই অর্থ সরাসরি ঋণগ্রহীতার হাতে দেওয়া হবে না। বরং যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি ভাষা কোর্সে ভর্তি হবেন, সেখানে সরাসরি টিউশন ফি পরিশোধ করবে ব্যাংক নিজেই— এতে অর্থ অপব্যবহারের সুযোগ কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী ভাষা শিক্ষার বাইরে অভিবাসন খাতের অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজেও এই তহবিল ব্যবহারের সুযোগ থাকবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের হাতে।
সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগ দেশের রেমিট্যান্স খাতে দক্ষতা-ভিত্তিক রূপান্তরের একটি প্রয়াস বলে মনে করা যেতে পারে। তবে ঋণের সীমা নির্ধারণ এবং তা যথাযথভাবে ব্যবহারের তদারকি নিশ্চিত করাই হবে এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধু ঋণের সুযোগ তৈরি করলেই দক্ষতা বাড়বে না, বরং তার সঠিক প্রয়োগ ও তদারকির ওপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সফলতা।

