সাধারণ মানুষের কাছে সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে একগুচ্ছ নতুন সুবিধা সংযোজনের পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, কোনো পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব, পাশাপাশি পেনশনারদের স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনার উদ্যোগ।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এসব প্রস্তাবের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। পদাধিকারবলে অর্থমন্ত্রীই এই পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়াতে স্বামী-স্ত্রীর আজীবন পেনশন সুবিধার প্রস্তাবসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব পর্ষদ সভায় তোলা হচ্ছে। পর্ষদ থেকে অনুমোদন পেলে এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন সম্ভব হলে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই এসব পরিবর্তন কার্যকর হতে পারে।
কেন এই সংস্কার প্রয়োজন হলো? দেশের মানুষের গড় বয়স বাড়তে থাকায় এবং ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমে গিয়ে নির্ভরশীলতার হার বাড়ার আশঙ্কা থেকে ২০২৩ সালের আগস্টে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু করেছিল সরকার। লক্ষ্য ছিল বয়োবৃদ্ধ জনগোষ্ঠীকে একটি টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনা।
কিন্তু চালুর তিন বছর পার হলেও এই স্কিমগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রত্যাশিত সাড়া ফেলতে পারেনি। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে ব্যাংক আমানতের তুলনায় কম রিটার্ন এবং তাৎক্ষণিক আনুতোষিক বা অন্য সুবিধার অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে।
সংখ্যার হিসাবেও এই তথ্য স্পষ্ট। গত তিন বছরে চারটি স্কিমের আওতায় মোট নিবন্ধিত হয়েছেন প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার গ্রাহক, যাদের জমা করা মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত সমতা স্কিমেই সবচেয়ে বেশি প্রায় দুই লাখ ৮৭ হাজার মানুষ যুক্ত হয়েছেন, যাদের জমা প্রায় ৫৭ কোটি টাকা।
সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত স্কিমে। ডলার সংকট মোকাবিলা ও প্রবাসীদের আর্থিক সুরক্ষার লক্ষ্যে চালু করা এই স্কিমে এখন পর্যন্ত মাত্র সাড়ে এগারোশর মতো প্রবাসী নিবন্ধিত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা একশরও কম। তাদের জমা করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত নতুন সুবিধাগুলো- এই দুর্বল সাড়ার প্রেক্ষাপটে সরকার এখন স্কিমটিকে আরও আকর্ষণীয় করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এর মধ্যে একটি বড় পদক্ষেপ হলো বেসরকারি ব্যাংক খাত ও অন্যান্য বিভিন্ন খাতের কর্মীদের বাধ্যতামূলকভাবে এই স্কিমের আওতায় আনার প্রস্তাব। একই সঙ্গে পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা বর্তমান ষাট বছর থেকে কমিয়ে পঞ্চান্ন বছর করার প্রস্তাবও পর্ষদ সভায় উঠছে।
বর্তমান নিয়মে কোনো ব্যক্তি ষাট বছর বয়সে পৌঁছালে মাসিক পেনশন পাওয়া শুরু করেন, এবং তিনি মারা গেলে তার নমিনি পঁচাত্তর বছর বয়স পর্যন্ত সমপরিমাণ পেনশন পান। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তার স্বামী বা স্ত্রী আজীবন এই সুবিধা পেয়ে থাকেন। এই বৈসাদৃশ্য দূর করে সর্বজনীন পেনশনকেও আকর্ষণীয় করতে নমিনির পরিবর্তে স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব তোলা হচ্ছে।
আইনে গ্রাহকদের জমা করা অর্থের একটি অংশ থেকে বিশেষ প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ার সুযোগের কথা বলা থাকলেও বাস্তবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ এখনো এই সুবিধা চালু করেনি। এখন এই সুবিধা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিদ্যমান নিয়মে দশ বছরের কম সময় চাঁদা দেওয়ার পর কোনো গ্রাহক মারা গেলে তার জমা অর্থ মুনাফাসহ নমিনিকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান থাকলেও জীবিত অবস্থায় স্কিম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এখন প্রস্তাব করা হচ্ছে, পাঁচ বছর টাকা জমা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক অক্ষমতার কারণে কেউ যদি স্কিম থেকে বের হতে চান, তাহলে কর্তৃপক্ষের বিশেষ বিবেচনায় পুরো জমা অর্থ তুলে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল স্কিমে বীমা সুবিধা যুক্ত করার, কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। পেনশনারদের জন্য একটি বীমা পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করে তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য বীমার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে মাত্র দশ থেকে বিশ টাকার মতো নামমাত্র প্রিমিয়াম নেওয়া হতে পারে।
পাশাপাশি ধর্মীয় বিবেচনায় যারা প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থায় আগ্রহী নন, তাদের কথা মাথায় রেখে একটি শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণ চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগামীকালের পর্ষদ সভায় এসব প্রস্তাব অনুমোদন পেলে দ্রুততম সময়ে এই নতুন সুবিধাগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সফল হলে এই সংস্কার সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

