পঞ্চগড়ের মাঠে মাঠে এখন সবুজ চায়ের গালিচা। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদন অঞ্চল এখন এই সমতলভূমি। হাজার হাজার ছোট চাষী নিজের জমিতে নিজের টাকা ঢেলে চা চাষ করেন। কিন্তু আইন তাদের পাশে দাঁড়ায় না। চা আইন, ২০১৬ এবং এর পরবর্তী সংশোধনী তাদের নাম দেয়, পরিচয় দেয়, কিন্তু নিশ্চয়তা দেয় না। পাতার দাম কত হবে, কে কিনবে, কবে টাকা পাবেন, এসবের কোনো আইনি গ্যারান্টি নেই। তাদের দেয়া হয় না সরকারের পক্ষ থেকে কোন ভর্তুকি।
আইনটির ইতিহাস
বাংলাদেশে চা শিল্প নিয়ন্ত্রণের প্রথম আইন ছিল Tea Ordinance, 1977। সামরিক ফরমান দিয়ে জারি হওয়া এই অধ্যাদেশ পরে অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়। তাই ২০১৬ সালে সংসদ নতুন করে আইন পাস করে, নাম দেয় চা আইন, ২০১৬। এই আইনের মাধ্যমেই বাংলাদেশ চা বোর্ড প্রতিষ্ঠার বৈধতা পায়। বোর্ডের হাতে থাকে চা চাষের নিবন্ধন, লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা।
তখনকার আইনে শুধু চা বাগানের কথা ছিল। সিলেট আর চট্টগ্রামের ইজারা নেওয়া সরকারি জমিতে যে বড় বাগান হয়, সেটাই ছিল আইনের মূল বিষয়। পঞ্চগড়সহ সমতলের চাষীরা নিজের জমিতে যে চা চাষ করেন, তার আলাদা কোনো স্বীকৃতি ছিল না। পরবর্তী সংশোধনীতে প্রথমবার ক্ষুদ্র ও মাঝারি চা চাষীদের কথা আইনে ঢোকে। চাষীর নিজের মালিকানার জমিও এখন আইনি ভাষায় চা চাষের জমি হিসেবে গণ্য হয়।
স্বীকৃতি আছে, সুরক্ষা নেই একজন চাষীর
কাগজে কলমে ছোট চাষীদের স্বীকৃতি দেয়া অগ্রগতি মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা আলাদা কথা বলে। আইনে চাষীর জমিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই জমিতে ফলানো পাতার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কোনো ধারা নেই। চাষী নিজের টাকায় গাছ লাগান, বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন, তারপর যখন পাতা তোলার সময় আসে, তখন দাম ঠিক করেন কারখানার মালিক। আইনে কারখানা মালিকের জন্য কাঁচা পাতা কেনার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
এখানেই আসল সমস্যা। ছোট চাষী নিজে কারখানা বসাতে পারেন না। কারখানা করতে যে মূলধন আর লাইসেন্স শর্ত লাগে, একজন সাধারণ কৃষকের পক্ষে তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। ফলে পাতা বিক্রির জন্য তাকে সবসময় বড় কারখানার দ্বারস্থ হতে হয়।
বোর্ডে দুইটি চেয়ার, তবুও ক্ষমতাহীন
আইনের একটি বড় পরিবর্তন হলো বাংলাদেশ চা বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদে চা উৎপাদনকারীদের জন্য দুটি সদস্যপদ রাখা। শুনতে ভালো লাগে, মনে হয় চাষীর কণ্ঠস্বর এবার নীতিনির্ধারণে পৌঁছাবে। কিন্তু বাস্তবে বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ বেশিরভাগ সদস্য সরকার মনোনীত। দুইজন চাষী প্রতিনিধি বোর্ডে বসলেও কারখানা মালিক ও ব্যবসায়ীদের প্রভাবের সামনে তাদের প্রভাব সীমিত থেকে যায়।
আইনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফাঁক আছে। কে ক্ষুদ্র চাষী আর কে মাঝারি চাষী, তার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা আইনে নেই। কত একর জমি বা কত কেজি উৎপাদন হলে কাউকে ক্ষুদ্র চাষী বলা হবে, সেটা ঠিক করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চা বোর্ডের ওপর। অর্থাৎ যে বোর্ডের সিদ্ধান্তে চাষীর ভাগ্য নির্ভর করে, সেই বোর্ডই ঠিক করবে চাষী আসলে কে। নিবন্ধন দেওয়া বা না দেওয়া, জমি চা চাষের অনুপযোগী ঘোষণা করা, এসব ক্ষমতাও বোর্ডের হাতে। চাষীর হাতে কোনো আইনি প্রতিকারের পথ স্পষ্ট নয়।
রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি কোথায়
সিলেট বা চট্টগ্রামের বড় বাগান মালিকরা শত বছরের জন্য নামমাত্র মূল্যে সরকারি খাস জমি লিজ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সেটাই ছিল তাদের বড় ভর্তুকি। অথচ সমতলের ক্ষুদ্র চাষী নিজের জমিতে, নিজের পুঁজিতে চা চাষ করেন, তবু আইনে তার জন্য ঋণ, ভর্তুকি বা প্রণোদনার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই।
ক্ষুদ্র চাষীরা এই ভর্তুকির জন্য চা বোর্ড ও স্থানীয় জেলা প্রসাশকের নিকট স্মারকপত্র দিলেও কাজ হয়নি কোন। কিন্ত সমতলের ক্ষুদ্র চাষীদের ভর্তুকির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কিন্ত প্রসাশন থেকে প্রতিবার আশ্বাস দেয়া হলেও, বাস্তবতা ভিন্ন।
সরকার কি নিজে চা পাতা কেনে
উত্তর হলো না। বাংলাদেশে সরকারের কোনো সংস্থা সরাসরি সমতলের ক্ষুদ্র চাষীর কাছ থেকে কাঁচা চা পাতা কেনে না। ধান বা পাটের ক্ষেত্রে যেমন সরকারি ক্রয়কেন্দ্র থাকে, চা পাতার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। যত পাতা উৎপাদন হয়, তার পুরোটাই কিনতে হয় বেসরকারি প্রক্রিয়াকরণ কারখানার মালিকদের কাছে। জাতীয় চা কোম্পানির (এনটিসি) মালিকানাধীন বাগান আছে সিলেট অঞ্চলে, কিন্তু পঞ্চগড়সহ সমতলের ক্ষুদ্র চাষীর পাতা কেনার জন্য কোনো সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রীয় কারখানা নেই।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটা কারখানা তদারকি কমিটি কাজ করে। এছাড়া, জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটা কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ কমিটিও বসে, যারা প্রতি মৌসুমে প্রতি কেজি পাতার একটা সর্বনিম্ন দর ঠিক করে দেয়। এই দর নির্ধারন মূলত প্রশাসনিক, কোন আইনি সিদ্ধান্ত না।
অর্থাৎ চাষীর পাতা কেনার পুরো প্রক্রিয়াটাই বেসরকারি খাতের হাতে, আর সরকারের ভূমিকা সীমাবদ্ধ একটা পরামর্শমূলক মূল্য ঘোষণায়, যার পেছনে আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। আর সরকারের সিদ্ধান্ত সবসময় কারখানা মালিকদের সুবিধা আর অলিগার্কদের মন রক্ষাকে প্রাধান্য দেয়। তা অজানা নয় কারো কাছে।
প্রতিবেশী দেশে চা শ্রমিকদের বাস্তবতা কেমন
বাংলাদেশের এই সংকট একা নয়। দক্ষিণ এশিয়ার চা শিল্পে শ্রমিক ও ছোট চাষীর ন্যায্য পাওনার লড়াই বহু পুরনো।
ভারতের আসামে দেশের সবচেয়ে বড় চা শিল্প। সেখানে প্ল্যান্টেশন লেবার আইনের অধীনে বাগান মালিকের ওপর আবাসন, চিকিৎসা ও শিক্ষার দায়িত্ব বর্তায়। ২০২৬ সালে আসামে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাগানে শ্রমিকরা দৈনিক প্রায় ২৮০ রুপি পান, আর বরাক উপত্যকায় তা প্রায় ২৫৮ রুপি। ভারতের আসাম রাজ্যের ক্ষুদ্র চা চাষীদের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি, প্রণোদনা ও কর ছাড়ের ব্যবস্থা করেছে। ২০২৬ সালের জুন থেকে ক্ষুদ্র চা চাষীদের আসাম ফারমার্স রেজিস্ট্রি পোর্টাল-এর অন্তর্ভুক্ত করে ‘ফারমার আইডি’ (Farmer ID) দেওয়া শুরু হয়েছে। যার মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি ঋণ ও সার ভর্তুকি পেয়ে থাকেন।
শ্রীলঙ্কার চিত্র আরও আলাদা। সেখানে বাগান শ্রমিকরা দীর্ঘদিন দৈনিক এক হাজার রুপি মজুরির দাবিতে আন্দোলন করেছেন। ধাপে ধাপে সরকার সেই দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শ্রীলঙ্কার আইনে ছোট চা চাষীদের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ আছে, যেখানে ক্ষুদ্র চাষীরা মোট উৎপাদনের সত্তর শতাংশের বেশি জোগান দেন।
তুলনা করলে দেখা যায়, ভারত ও শ্রীলঙ্কা উভয় দেশে অন্তত মজুরি নির্ধারণের একটা নিয়মিত ও আইনি কাঠামো আছে, যেখানে সরকার, মালিক ও শ্রমিক সংগঠন একসঙ্গে বসে দর কষাকষি করে। বাংলাদেশের চা আইনে চাষীর পাতার দামের জন্য এমন কোনো নিয়মিত প্রক্রিয়ার কথা নেই।
কী পরিবর্তন দরকার
আইন বিশেষজ্ঞ ও চাষী সংগঠনগুলোর মূল দাবি স্পষ্ট। ক্ষুদ্র ও মাঝারি চা চাষীর একটা স্পষ্ট সংজ্ঞা আইনে থাকতে হবে, যা বোর্ডের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করবে না। দ্বিতীয়ত, কাঁচা পাতার একটা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য আইনে বেঁধে দিতে হবে, ঠিক যেভাবে ধান বা পাটের ক্ষেত্রে সরকার মূল্য নির্ধারণ করে। কারখানা মালিকদের জন্য নিবন্ধিত চাষীর পাতা কেনার বাধ্যবাধকতা রাখতে হবে। সমতলের ছোট চাষীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকির ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
পঞ্চগড়ের একজন চা চাষীর ভাষায় বললে, আইন তাকে পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু পকেটে টাকা দেয়নি। যতদিন না পাতার দাম আইনি সুরক্ষা পায়, ততদিন এই স্বীকৃতি কাগজেই থেকে যাবে।

