বিশেষ বিশ্লেষণ
একটা প্রশ্ন খুব সহজ শোনায়, কিন্তু উত্তরটা মোটেও সহজ না, বড় কোম্পানি যখন ছোট কোম্পানিকে কিনে নেয়, তখন বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ে, নাকি কমে? সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হতে পারে, প্রতিযোগী কমে গেলে প্রতিযোগিতাও কমবে। কিন্তু বাস্তবতা এত সরলরৈখিক না। ২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বন্ধ হওয়া একটা ডিল এই প্রশ্নটাকে একদম হাতেকলমে বুঝিয়ে দেয়; যেখানে দেশটার প্রতিযোগিতা-নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই স্বীকার করেছে যে বাজার আরও ঘনীভূত হবে, তারপরও তারা ডিলটাকে থামায়নি। কেন থামায়নি, সেই ব্যাখ্যার ভেতরেই লুকিয়ে আছে মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন নিয়ে অর্থনীতির সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে বিতর্কিত দ্বন্দ্বটা, ইকোনমিস অব স্কেলের সুবিধা বনাম মনোপলির ঝুঁকি।
ডিলটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর টি-মোবাইলের সঙ্গে আঞ্চলিক অপারেটর ইউএস সেলুলারের। ২০২৪ সালের মে মাসে ঘোষণা হওয়া এই চুক্তির মূল্য ছিল প্রায় ৪৪০ কোটি ডলার, যার মধ্যে ২৬০ কোটি ডলার নগদ আর বাকিটা দায় বা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) এবং ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি); দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থাই ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অনুমোদন দেয়, আর ১ আগস্ট চুক্তিটা সম্পন্ন হয়। ফলাফল, টি-মোবাইল পেয়ে যায় ইউএস সেলুলারের গ্রাহক, স্টোর এবং প্রায় ৩০ শতাংশ স্পেকট্রাম। আর ইউএস সেলুলার নিজের নাম পাল্টে হয়ে যায় “অ্যারে ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার”। একটা টাওয়ার ও অবকাঠামো কোম্পানি, যেটা এখনো প্রায় সাড়ে চার হাজার টাওয়ার এবং নিজের বাকি ৭০ শতাংশ স্পেকট্রাম ধরে রেখেছে। অর্থাৎ কোম্পানিটা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, বরং ব্যবসার ধরন বদলে ফেলেছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন বাধা দিল না
ডিওজের অ্যান্টিট্রাস্ট ডিভিশনের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল গেইল স্লেটার নিজের বিবৃতিতে যে যুক্তি দিয়েছিলেন, সেটাই এই পুরো গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। তার ভাষ্যমতে, ইউএস সেলুলার প্রযুক্তিতে যে পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ দরকার ছিল নেটওয়ার্ক প্রতিযোগিতাসক্ষম রাখতে, সেটা জোগাড় করতে পারছিল না, ফলে তাদের নেটওয়ার্কের মান ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছিল। এফসিসিও প্রায় একই সুরে বলেছে, এই অধিগ্রহণে নেটওয়ার্ক দক্ষতা ও স্পেকট্রাম ব্যবহার বাড়বে, বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় কভারেজ ও ক্যাপাসিটি বাড়বে। এটাই হচ্ছে ইকোনমিস অব স্কেলের ক্লাসিক যুক্তি; একই অবকাঠামো, স্পেকট্রাম আর প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ যখন বেশি গ্রাহকের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, তখন প্রতি ইউনিট খরচ কমে যায়, আর সেই সাশ্রয় তত্ত্বগতভাবে গ্রাহকের কাছেও পৌঁছানোর কথা; ভালো নেটওয়ার্ক, বেশি কভারেজ, প্রতিযোগিতামূলক দামের মাধ্যমে। প্রতিযোগিতা আইনে একে বলা হয় “এফিশিয়েন্সি” যুক্তি, আর যখন কোনো কোম্পানি সত্যিই ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে বলে প্রমাণিত হয়, তখন তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটা ধারণা কাজ করে; দুর্বল বা “ব্যর্থপ্রায়” প্রতিযোগীর সম্পদ বাজার থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে অন্য কারো হাতে গিয়ে সচল থাকাই ভালো। ডিওজে এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আইনি “ফেইলিং ফার্ম ডিফেন্স” প্রয়োগ করেনি, সেটার জন্য কঠোর তিনটা শর্ত পূরণ করতে হয় আদালতে কিন্তু তাদের যুক্তির কাঠামোটা একই দর্শন থেকে এসেছে।
কিন্তু এখানেই গল্পটা থেমে যায়নি। একই বিবৃতিতে স্লেটার নিজেই সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই ডিলের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মোবাইল বাজারে টি-মোবাইল, এটিঅ্যান্ডটি আর ভেরাইজন; এই তিন বড় অপারেটরের হাতে এখন দেশের প্রায় ৩৩ কোটি ৫০ লাখ মোবাইল সংযোগের ৯০ শতাংশেরও বেশি চলে গেছে। তার নিজের ভাষায়, এটা একটা “সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত” কয়েক দশক ধরে চলা একত্রীকরণের প্রবণতার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাজার, যেখানে বেশিরভাগ গ্রাহকের সামনে অর্থবহ পছন্দ বলতে এখন কেবল এই “বিগ থ্রি”-ই আছে। স্পেকট্রাম একত্রীকরণ নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির কথা বলেছেন তিনি, আর ভবিষ্যতের ডিলগুলোতে আরও কড়া নজরদারির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, একই নিয়ন্ত্রক যদি নিজেই স্বীকার করেন যে বাজার আরও সংকুচিত হচ্ছে, তাহলে কেন তিনি ডিলটা আটকালেন না?
সংখ্যার পেছনের যুক্তি
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রতিযোগিতা আইনের একটা মৌলিক পরিমাপক যন্ত্রের কথা জানা দরকার; হারফিন্ডাল-হার্শম্যান ইনডেক্স, সংক্ষেপে এইচএইচআই। এটা হিসাব করা হয় বাজারের প্রতিটা কোম্পানির মার্কেট শেয়ারকে বর্গ করে যোগ করে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন ও বিচার বিভাগ যৌথভাবে নতুন মার্জার গাইডলাইন প্রকাশ করে, যেখানে তারা “অতিমাত্রায় ঘনীভূত” বাজারের সীমারেখা আগের ২৫০০ থেকে নামিয়ে ১৮০০-তে নিয়ে আসে। সহজ কথায়, একটা বাজারে যদি মার্জারের পর এইচএইচআই ১৮০০ ছাড়িয়ে যায় এবং সেই মার্জারের কারণে এইচএইচআই অন্তত ১০০ পয়েন্ট বাড়ে, তাহলে আইনত ধরে নেওয়া হয় যে সেই মার্জার প্রতিযোগিতার জন্য ক্ষতিকর আর এটাকে “স্ট্রাকচারাল প্রেজাম্পশন” বলা হয়। একইভাবে যদি একীভূত কোম্পানির বাজার শেয়ার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, সেটাও একই সন্দেহের আওতায় পড়ে। টেলিকম বাজারে মাত্র তিনটা বড় খেলোয়াড় নিয়ে হিসাব করলে এইচএইচআই এমনিতেই অনেক বেশি থাকার কথা; আর একটা চতুর্থ প্রতিযোগীকে সেই তিনজনের একজন কিনে নিলে সংখ্যাটা আরও বাড়বে, এটা অনুমান করা কঠিন কিছু না। তাহলে গাইডলাইনের চোখে এই ডিল সন্দেহজনক হওয়ারই কথা।
তাহলে ডিওজে কেন ছাড় দিল? এখানেই আসে আমার নিজের পর্যবেক্ষণ, যেটা কেবল সংবাদ পড়ে নয়, বরং একই মার্জার গাইডলাইনের ভেতরকার যুক্তি মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়। গাইডলাইনের মধ্যেই এমন একটা নীতি আছে, যা বলে, যদি প্রমাণ হয় যে কোনো কোম্পানি এমনিতেই বাজার থেকে হারিয়ে যেত মার্জার ছাড়াও, তাহলে সেই কোম্পানিকে কিনে নেওয়াটা প্রতিযোগিতা “কমানো”র বদলে বরং তার সম্পদটাকে বাজারে সচল রাখার একটা উপায়। যুক্তিটা এইরকম – প্রতিযোগী হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল সংখ্যা কমা নয়; আসল প্রশ্ন হলো, মার্জার না হলে বাজারের অবস্থা তুলনায় ভালো থাকত, নাকি খারাপ থাকত। ইউএস সেলুলারের ক্ষেত্রে ডিওজের যুক্তি ছিল, কোম্পানিটা এমনিতেই পুঁজির অভাবে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছিল, ফলে গ্রাহকরা এমনিতেও একটা খারাপ মানের নেটওয়ার্কের দিকে যাচ্ছিল। তাই তুলনাটা “প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজার বনাম টি-মোবাইলের হাতে যাওয়া বাজার” নয়, বরং “ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়া একটা দুর্বল প্রতিযোগী বনাম শক্তিশালী নেটওয়ার্কে একীভূত হওয়া গ্রাহক” এই দুইয়ের মধ্যে তুলনা।
তবে এই যুক্তিটাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করাও বিপজ্জনক, আর এখানেই আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণটা আসে। একই মার্জার গাইডলাইনে আরও একটা নীতি স্পষ্ট করে বলা আছে, যদি কোনো শিল্পখাতে ক্রমাগত একত্রীকরণের প্রবণতা দেখা যায়, তাহলে নিয়ন্ত্রকদের উচিত একটামাত্র ডিল আলাদাভাবে না দেখে পুরো ধারাবাহিকতাটা বিবেচনা করা। কারণ প্রতিটা আলাদা ডিল হয়তো একা একা যুক্তিসংগত মনে হতে পারে; একটা দুর্বল কোম্পানিকে বাঁচানো, দক্ষতা বাড়ানো, গ্রাহকের উপকার কিন্তু যদি এই যুক্তি বছরের পর বছর ধরে একের পর এক ডিলে প্রয়োগ হতে থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে বাজারটা কার্যত তিন বা চারটা কোম্পানির হাতে চলে যায়, আর নতুন কোনো প্রতিযোগীর প্রবেশের সুযোগই থাকে না। টেলিকম খাতে এটা আরও স্পষ্ট, কারণ স্পেকট্রাম একটা সীমিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত সম্পদ। যে কেউ চাইলেই নতুন প্রতিযোগী হয়ে বাজারে ঢুকে যেতে পারে না, যেভাবে খাদ্য বা পোশাকের বাজারে সম্ভব। ফলে অর্থনীতিবিদরা যাকে “কনটেস্টেবল মার্কেট” বলেন অর্থাৎ নতুন প্রতিযোগী ঢোকার বাস্তব সম্ভাবনাই পুরনো কোম্পানিগুলোকে সংযত রাখে; টেলিকমের ক্ষেত্রে সেই তত্ত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণেই ডিওজে নিজেই সতর্ক করেছে যে চতুর্থ জাতীয় খেলোয়াড় হিসেবে যাকে ভাবা হচ্ছিল, সেই কোম্পানির ভবিষ্যৎও এখন অনিশ্চিত।
তাহলে মূল প্রশ্নে ফিরি, বড় কোম্পানি ছোট কোম্পানি কিনলে প্রতিযোগিতা বাড়ে, না কমে? সৎ উত্তর হলো, এর কোনো একরৈখিক উত্তর নেই, তবে তিনটা মাপকাঠি দিয়ে বিচার করা যায়। প্রথমত, ইকোনমিস অব স্কেলের যে সাশ্রয়ের কথা বলা হয়, সেটা বাস্তবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় কি না, নাকি শুধু একীভূত কোম্পানির মুনাফায় থেকে যায়। দ্বিতীয়ত, বাজারটা সত্যিকার অর্থে এখনো “কনটেস্টেবল” আছে কি না, অর্থাৎ নতুন প্রতিযোগী ঢোকার বাস্তব সুযোগ আছে কি না, নাকি লাইসেন্স, স্পেকট্রাম বা মূলধনের বাধায় সেই দরজা কার্যত বন্ধ। আর তৃতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো একটা একটা ডিলকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখছে, নাকি পুরো খাতের ক্রমপুঞ্জীভূত প্রবণতাটা মাথায় রাখছে। টি-মোবাইল-ইউএস সেলুলার ডিলে প্রথম শর্তটা মোটামুটি পূরণ হয়েছে বলা যায়, নেটওয়ার্ক মানের উন্নতি ও গ্রামীণ কভারেজ বাড়ার প্রতিশ্রুতি এফসিসি নিজেই যাচাই করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয় শর্ত নিয়ে খোদ নিয়ন্ত্রকদের নিজেদের ভাষাতেই উদ্বেগ স্পষ্ট। তাই এই একটামাত্র ডিল বিচার করলে বলা যায়, এটা প্রতিযোগিতা “বাড়ায়নি” ঠিক, কিন্তু “মেরেও ফেলেনি” বরং একটা মৃতপ্রায় প্রতিযোগীকে দ্রুত বিদায় নেওয়া থেকে বাঁচিয়ে গ্রাহকের তাৎক্ষণিক উপকার নিশ্চিত করেছে। আসল ঝুঁকিটা এই একটা ডিলে নয়, বরং এই যুক্তি বারবার প্রয়োগ হতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে বাজারটা কতটা সংকুচিত হয়ে যায়, সেখানেই লুকিয়ে আছে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

