ব্যবসায়ী ও কাস্টমস এজেন্টদের তীব্র আপত্তির মুখে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে বন্দর চার্জ পরিশোধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। মাত্র একদিনের মাথায় এই সিদ্ধান্ত বাতিল হওয়ায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বন্দরকেন্দ্রিক ডিজিটাল সংস্কারের পথে বাস্তবতা ও নীতিনির্ধারণের মধ্যে এখনও যথেষ্ট ফাঁক রয়ে গেছে।
মঙ্গলবার সকালে নতুন এই পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর সঙ্গে সঙ্গেই কার্যক্রমে বিঘ্ন দেখা দেয়। সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত পণ্য খালাসের কাজ থমকে থাকে, কারণ অসংখ্য আমদানি-রপ্তানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের নির্ধারিত সেই একটি ব্যাংকে কোনো হিসাবই ছিল না। ফলে সময়মতো চার্জ পরিশোধ করতে না পারায় পণ্য খালাসে বিলম্ব এবং তার জেরে বাড়তি ডেমারেজ খরচের আশঙ্কা তৈরি হয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
মূল প্রশ্নটি ছিল যৌক্তিকতা নিয়ে—আগে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে একাধিক ব্যাংকের মাধ্যমে চার্জ পরিশোধের সুযোগ থাকলেও, আচমকা কেন কেবল একটি ব্যাংকেই এই পুরো লেনদেন সীমিত করে দেওয়া হলো, তা নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের একজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা এই বিষয়ে মন্তব্য করেন, ব্যবসায়ীদের হিসাব বিভিন্ন ব্যাংকে ছড়িয়ে থাকে বলে সবাইকে একটিমাত্র ব্যাংকের গ্রাহক হতে বাধ্য করা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, আগে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে কয়েকটি ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধের সুযোগ থাকায় প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল, কিন্তু আকস্মিক এই পরিবর্তন ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে বন্দর কর্তৃপক্ষ একই দিন বিকেলেই আগের বহু-ব্যাংক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে।
এই ঘটনার পেছনে রয়েছে বন্দরকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও কাগজবিহীন করার একটি বৃহৎ পরিকল্পনা। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন জাহাজ সংক্রান্ত সব বিল সম্পূর্ণভাবে অনলাইনে প্রক্রিয়া করা হচ্ছে, এবং কনটেইনার ও পণ্য গ্রহীতার বিল টার্মিনাল পরিচালনা ব্যবস্থার (টিওএস) মাধ্যমে তৈরি ও সংগ্রহ করা হবে। নতুন সার্ভিস সেন্টারে একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের বুথ স্থাপনের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সংযোগের মাধ্যমে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও চব্বিশ ঘণ্টা অনলাইন পেমেন্ট সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক প্রবেশ-নির্গমন পাস, সময়-স্লট ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল চালান ব্যবস্থা।
পরিকল্পনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে চার্জ পরিশোধ না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ কর্তনের একটি ব্যবস্থাও চালু করা হবে। এ ছাড়া নিলামে বিক্রি হওয়া পণ্য সরবরাহের প্রক্রিয়া সরাসরি জাতীয় রাজস্ব ব্যবস্থা ও কাস্টমসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, যাতে নথি যাচাই ও তথ্য আদান-প্রদান আরও দ্রুত হয়। প্রবেশ-নির্গমন সংক্রান্ত টিকিট ব্যবস্থাকে ডিজিটাল পাসের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং পণ্যাগারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে এই সংস্কার কর্মসূচিতে। সব মিলিয়ে কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বন্দরের কার্যক্রমকে সম্পূর্ণভাবে কাগজবিহীন ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
তবে এই মহাযাত্রার বাস্তবায়ন নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে সংশয় স্পষ্ট। একটি সংগঠনের প্রতিনিধি অভিযোগ করেছেন, টার্মিনাল পরিচালনা ব্যবস্থা চালুর পর থেকেই তা যথাযথভাবে কাজ করছে না। কোথাও পর্যাপ্ত জনবলের ঘাটতি, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম থাকলেও তার সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় পণ্য সরবরাহে দেরি হচ্ছে বলে তাঁর দাবি। এই প্রযুক্তিগত ঘাটতিই আমদানি-রপ্তানিকারক ও কাস্টমস এজেন্টদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামগ্রিকভাবে বন্দর ব্যবহারকারীদের বক্তব্য হলো, ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে পণ্য খালাসের গতি বাড়তে পারে—এই সম্ভাবনা তাঁরা অস্বীকার করছেন না। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁদের প্রত্যাশা, পেমেন্ট ব্যবস্থাটি এমনভাবে সাজানো হোক যাতে ব্যবসায়ীদের নতুন করে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকে হিসাব খুলতে বাধ্য না হয়ে নিজেদের প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করেই লেনদেন সম্পন্ন করা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও জনবল প্রস্তুতি ছাড়া তাড়াহুড়ো করে নতুন ব্যবস্থা চালু করলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের বিভ্রান্তি ও প্রতিবাদের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

