দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন খরচ বাড়তে শুরু করায় এর প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। এরই মধ্যে আটা ও ময়দার দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে চাল, ডিমসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দামও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন করে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলো।
ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব বাজারে পড়া স্বাভাবিক হলেও অনেক সময় প্রকৃত খরচ বৃদ্ধির তুলনায় পণ্যের দাম বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাই বাজারে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগেই আটা ও ময়দার বাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছিল। গত সপ্তাহে নতুন করে এই দুই পণ্যের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে প্যাকেটজাত আটা প্রতি কেজি ৭০ টাকা এবং ময়দা ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগেও এসব পণ্যের দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ টাকা ও ৭০ টাকা।
অন্যদিকে খোলা আটা ও ময়দার দাম তুলনামূলক কম হলেও সেখানেও মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। খোলা আটা বর্তমানে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন দামে পণ্য সরবরাহ করছে, ফলে খুচরা বাজারেও দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে প্যাকেটজাত আটার দাম প্রায় ৪ শতাংশ এবং ময়দার দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
আটা-ময়দার পর এবার চালের বাজার নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার সম্ভাবনার কথা বলছেন।
চাল ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চাল পরিবহনে ট্রাক ভাড়া বেড়েছে। ফলে চালের সরবরাহ খরচও বাড়ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের এক পাইকারি চাল ব্যবসায়ী জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ১৫ টন চাল আনার জন্য আগে ট্রাক ভাড়া দিতে হতো ১৭ হাজার টাকা। বর্তমানে একই পরিবহনের জন্য প্রায় ৪ হাজার টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
এই বাড়তি পরিবহন খরচ হিসাব করলে প্রতি কেজি চালে প্রায় ২৭ পয়সা অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বাজারে এর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বর্তমানে আগের কেনা চাল বাজারে রয়েছে। নতুন চালের চালান বিক্রি শুরু হলে পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব দামের মধ্যে দেখা যেতে পারে।
জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির প্রভাব শুধু চালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মুড়ি, চিড়া, খইসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের পরিবহন খরচও বাড়ছে।
কারওয়ান বাজারের এক পাইকারি ব্যবসায়ী জানান, বরিশাল থেকে মুড়ি আনতে আগে প্রায় ১৬ হাজার টাকা পরিবহন খরচ হতো। বর্তমানে একই পণ্য আনতে প্রায় ৩ হাজার টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
এর ফলে প্রতি কেজি মুড়ির পরিবহন খরচ প্রায় এক টাকা বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে।
ডিমের বাজারেও বাড়তি চাপ দেখা যাচ্ছে। কয়েক মাস ধরে ডিমের দাম তুলনামূলক বেশি রয়েছে। বর্তমানে ফার্মের বাদামি ডিম প্রতি ডজন প্রায় ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চারটি ডিম কিনতে ক্রেতাকে দিতে হচ্ছে প্রায় ৫৫ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ডিমের দাম আরও বাড়তে পারে।
ভোজ্যতেলের বাজারেও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে বোতলজাত ভোজ্যতেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এরপরও বড় বোতলের সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে জানিয়েছেন খুচরা বিক্রেতারা।
সম্প্রতি প্যাকেটজাত তরল দুধের দামও লিটারে ১০ টাকা বেড়েছে। পাশাপাশি আমদানি করা ফলের দামেও ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে বাজারে মালটা ও কমলা প্রতি কেজি ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং আপেল ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। লাল আঙুরের দাম প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
ব্যবসায়ীরা এসব পণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে সব ধরনের পণ্যের দাম সমানভাবে বাড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ কতটা বাড়বে এবং এর প্রভাব কোন পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ে কতটা পড়বে, তা নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের মতো সংস্থাগুলো যদি তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রকাশ করে, তাহলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে। এতে ব্যবসায়ীরাও অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বাজারে পণ্যের দামে যে পরিমাণ প্রভাব পড়ার কথা, কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি দাম বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, পরিবহন খরচ কেজিতে সামান্য বাড়লেও সেই অজুহাতে পণ্যের দাম কয়েক গুণ বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে না।
তিনি আরও জানান, বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিবহন খরচ কতটা বাড়ছে এবং পণ্যের দাম কতটা পরিবর্তন হচ্ছে, তা যাচাই করা হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি বর্তমানে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে প্রভাব ফেলছে। তবে এর সবচেয়ে বড় চাপ অনুভব করছে সাধারণ ভোক্তারা। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর নজরদারি, সঠিক তথ্যভিত্তিক মূল্য বিশ্লেষণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

