আজ একটা অদ্ভুত ধাঁধা নিয়ে কথা বলি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে বিশ্ব খাদ্যমূল্য সূচক গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে উঠেছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ। আগস্টের সংশোধিত সূচক ছিল ১৩৪। সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো সতর্ক করেছেন, এই চাপ টিকে থাকলে শিগগিরই তা ভোক্তার বাজারে পৌঁছাবে, বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানির জন্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে। অথচ একই সময়ে নওগাঁর মাঠে কৃষক আউশ ধান বেচছেন গত বছরের চেয়ে অনেক কম দামে। একদিকে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ছে, অন্যদিকে আমার দেশের কৃষক ধানের দাম না পেয়ে লোকসান গুনছেন। দুটো খবর একসঙ্গে পড়লে মনে হয় একটা অন্যটার উল্টো। আমার মতে এরা আসলে একই গল্পের দুটো অধ্যায়।
গুদাম ভরা, তবু ভয় কেন?
আগে দেখি ভয়টা কোথা থেকে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্র সিপিসি ১০ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, এল নিনো শক্তিশালী হচ্ছে এবং উত্তর গোলার্ধের শরৎ ও শীতে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ডব্লিউএফপি হিসাব করেছে, এই এল নিনোর কারণে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ অন্তত ৪ কোটি ৯০ লাখ মানুষ নতুন করে তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় পড়তে পারে, যার ৮২ লাখ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। এর সঙ্গে আছে সারের সমস্যা। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে সারের দামসূচক ৩০ শতাংশের বেশি এবং ইউরিয়ার দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়ার কথা, কারণ বিশ্বের সার বাণিজ্যের প্রায় এক তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। তবে ছবিটা এখনো একতরফা নয়। এফএও বলছে, এ বছরের বিশ্ব শস্য উৎপাদন প্রায় ২৯৮ কোটি টন হবে, যা ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল। অর্থাৎ সংকটটা আজকের খাদ্য ঘাটতির নয়, আগামী মৌসুমের ফলনের। হরমুজ দিয়ে তেলের প্রবাহও সেপ্টেম্বরে অনেকটা ফিরেছে, যদিও বিভিন্ন সংস্থার হিসাব মেলে না এবং জাহাজ ভাড়া ও বিমার খরচ এখনো চড়া।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংখ্যাগুলো আরও স্পষ্ট করে দেয় ঝুঁকিটা কোথায়। এফএও ও আইপিসির বিশ্লেষণ বলছে, মে থেকে আগস্টে দেশে ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় ছিলেন, আর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরে এই সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখ হতে পারে, অর্থাৎ ১৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ জরুরি পর্যায়ের অবস্থায় পড়ার আশঙ্কা আছে। অথচ চালের মজুত নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। এফএও এ বছর ধানের উৎপাদন ৬ কোটি ১৯ লাখ টন হবে বলে আভাস দিয়েছে, যা গত চার বছরের গড়ের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে ১২ সেপ্টেম্বর সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২৩ লাখ ৪১ হাজার টন, এক বছর আগে ছিল ১৮ লাখ ৬৭ হাজার টন। তাহলে সংকটটা কোথায়? এখানেই কাজে আসে অমর্ত্য সেনের এনটাইটেলমেন্ট তত্ত্ব। তাঁর যুক্তি, দুর্ভিক্ষ বা খাদ্য সংকটের মূল কারণ অনেক সময় খাদ্যের অভাব নয়, মানুষের খাবার কেনার সামর্থ্য হারানো। এঙ্গেলের সূত্র আমাদের আরও কঠিন বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়, যে আয় যত কম, আয়ের তত বড় অংশ যায় খাবারে। বিবিএসের বিশ্লেষণ (২০২৩ সালের জুনে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে) বলছে, ৬২ শতাংশ পরিবার আয়ের অন্তত অর্ধেক খাবারে খরচ করে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিস্থিতি তখনকার চেয়ে খুব একটা ভালো হয়নি। তার ওপর আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬ শতাংশ আর মজুরি বেড়েছে ৮.০৫ শতাংশ, অর্থাৎ মজুরির প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা সামান্য হলেও কমছে। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৭.০২ শতাংশে নেমেছে, আর আমার ধারণা এটা স্বস্তির লক্ষণ নয়। এফএও নিজেই বলছে, বিশ্ববাজারের চাপ এখনো ভোক্তার বাজারে পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
কৃষকের হিসাবের খাতায় কী লেখা আছে
এবার মাঠের দিকে তাকাই, কারণ সংকটের বীজ আসলে সেখানেই বোনা হচ্ছে। ডিজেলের দাম ফেব্রুয়ারিতে ছিল লিটারপ্রতি ১০০ টাকা, এপ্রিলে হয় ১১৫ টাকা, আর ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩৫ টাকা, অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেশি। দেশের মোট ডিজেলের প্রায় ১৫ শতাংশ যায় কৃষিতে, বেশির ভাগ সেচে, আর ১২ লাখের বেশি সেচপাম্প চলে ডিজেলে। এই খরচ বাড়ার সঙ্গে ধানের দাম কিন্তু বাড়েনি, উল্টে কমেছে। নওগাঁর এক কৃষক বিঘাপ্রতি ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ করে ১২ থেকে ১৬ মণ আউশ পেয়েছেন, অথচ বাজারে মণপ্রতি দাম ৭২৫ টাকার আশপাশে। তাঁর নিজের হিসাবে বিঘায় লোকসান ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। গত বছর একই সময়ে আউশের দাম ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, এবার মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কম। মিলাররা বলছেন, আগের আমদানির কারণে গুদামে মজুত বেশি, তাই তাঁরা ধান কিনছেন না, আর সরকারি সংগ্রহও কয়েক মাস বন্ধ ছিল। অর্থাৎ মাঠে কৃষক সস্তা ধান আর দামি ডিজেলের কাঁচির মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছেন।
এখানেই আসে আমার মূল পর্যবেক্ষণ, যার ভিত্তি কোবওয়েব থিওরি। এই তত্ত্ব বলে, কৃষক সামনের মৌসুমে কী চাষ করবেন তা ঠিক করেন এই মৌসুমের দাম দেখে। এ বছর দাম কম হলে পরের বছর তিনি কম জমিতে চাষ করেন বা কম সার দেন, ফলে পরের বছর জোগান কমে দাম লাফিয়ে ওঠে। প্রমাণ আমাদের চোখের সামনেই আছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে আউশের আবাদ ২ লাখ ১৪ হাজার হেক্টর কমেছে আর উৎপাদন কমেছে ৫ লাখ টন। কৃষক আসলে নীরবে ভোট দিয়ে যাচ্ছেন। তাই আজ কৃষকের লোকসান আর কাল ভোক্তার বাড়তি দাম আলাদা দুটো সমস্যা নয়, একই চক্রের দুই পিঠ। বোরোর প্রস্তুতি শুরু হয় নভেম্বরে, আর এখনই সারের পরিস্থিতি চাপের মুখে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী ২৪ আগস্ট ইউরিয়ার মজুত ছিল ৪ লাখ ৮২ হাজার টনের কাছাকাছি, যা ৫ লাখ টনের নিরাপদ সীমার নিচে। ৯ সেপ্টেম্বর সংসদে সরকার জানিয়েছে মজুত ৪ লাখ ৯ হাজার টন এবং গুরুতর সংকটের দাবির কোনো ভিত্তি নেই। দুই হিসাব সরাসরি তুলনাযোগ্য না-ও হতে পারে, তবে চলতি অর্থবছরে ইউরিয়ার চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ ২২ হাজার টন, আর পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার সবকটি এখনো পুরোদমে চলছে না।
২০০৮ সালের সেই অভিজ্ঞতা কি ফিরছে?
ইতিহাস এখানে একটা সতর্কবার্তা দেয়, তবে অন্ধভাবে তুলনা করা ঠিক হবে না। মার্কিন কৃষি বিভাগের গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ২০০৮ সালের এপ্রিলের শেষে থাইল্যান্ডের চালের দাম টনপ্রতি ১ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা ফেব্রুয়ারির দামের দ্বিগুণ আর এক বছর আগের তিন গুণ। মজার কথা, সেই বছরের বিশ্ব চাল উৎপাদন ছিল রেকর্ড পরিমাণ। দাম বাড়ার প্রধান কারণ ছিল ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো বড় রপ্তানিকারকদের রপ্তানি বিধিনিষেধ আর তার পর আমদানিকারকদের আতঙ্কিত কেনাকাটা। অর্থাৎ ভয়ই তখন দামকে টেনে তুলেছিল। ভারত অতীতে দেশীয় দাম বাড়লে চালের রপ্তানি সীমিত করেছে, এবার শীতে তারা কী করে তা আমদানিকারক দেশগুলোর কাছে বড় নজরদারির বিষয়। তবে ২০২৬ সালের একটা বড় পার্থক্য আছে। আমাদের সরকারি মজুত এক বছর আগের চেয়ে বেশি, চাল আমদানি এফএওর হিসাবে গত বছরের ১৯ লাখ টন থেকে নেমে ৮ লাখ টনে আসার কথা। অর্থাৎ আমাদের হাতে সময় আছে, আর সেই সময়টাই কাজে লাগাতে হবে।
ডিসেম্বরের আগে যে সিদ্ধান্তগুলো জরুরি
আমি যা দেখছি, ঝুঁকির আসল সময়সীমা ডিসেম্বর, কারণ বোরো রোপণ হয় ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে। প্রথমত, সার কিনতে দেরি করলে বাজারের চাপের মুখে বেশি দামে কিনতে হবে, তাই আগাম ক্রয় এবং একাধিক উৎস থেকে আনা দরকার। দ্বিতীয়ত, কৃষকের লোকসান থামাতে ধানের একটা ন্যূনতম সংগ্রহ মূল্য কোবওয়েবের চক্র ভাঙার সবচেয়ে সরাসরি উপায়। অর্থনীতিবিদ আবদুল বায়েসও আউশের জন্য সংগ্রহ মূল্য চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। তৃতীয়ত, জ্বালানি ভর্তুকির প্রশ্নে সততার সঙ্গে স্বীকার করতে হবে যে সরকারের হাতও বাঁধা। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে ২১ সেপ্টেম্বরের আগে প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির লোকসান ছিল প্রায় ৮৯ টাকা, আর মার্চ থেকে আগস্টে সংস্থাটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। তাই সবার জন্য ভর্তুকি টানা কঠিন, কিন্তু সেচের ডিজেলে লক্ষ্যভিত্তিক ও নির্দিষ্ট মেয়াদের সহায়তা বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে, সঙ্গে সৌরচালিত পাম্পে বিনিয়োগ। চতুর্থত, সেনের যুক্তি মেনে বলতে হয়, গুদাম ভরা রাখাই যথেষ্ট নয়। ওএমএস, টিসিবির বিক্রি আর সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের জন্য নগদ বা খাদ্য সহায়তা চালু রাখলে তবেই মজুত মানুষের থালায় পৌঁছাবে। গুদামে আজ পর্যাপ্ত চাল থাকলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কৃষক যদি উৎপাদনে লোকসান করে আগামী মৌসুমে চাষ কমিয়ে দেন, তাহলে আজকের মজুতই ভবিষ্যতের ঘাটতি ঠেকাতে পারবে না। তাই কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার জন্য খাদ্যের দাম সহনীয় রাখা; দুটো আলাদা নীতি নয়; একই খাদ্যনিরাপত্তা কৌশলের অংশ।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

