গত কয়েক দিন ধরে মিরপুর, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের সড়কে শ্রমিকদের যে আন্দোলন চলছে, তার প্রধান দাবি পরিষ্কার: ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছিলো। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর অন্তত ৫২৯টি কারখানার কাজ বিঘ্নিত হয়েছে এবং এক দিনেই সাত লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করতে পারেননি। এর মধ্যেই গতকাল, ৪ নভেম্বর নতুন মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠকে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা একমত হয়েছেন, নতুন মজুরি কাঠামো ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে এবং বাড়তি মজুরি শ্রমিকেরা হাতে পাবেন জানুয়ারি মাসে। তবু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রায় ১০ হাজার নিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়ন থাকার পরও মজুরির মতো মৌলিক দাবি মেটাতে শ্রমিকদের কেন মহাসড়কে নামতে হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা, কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা জরুরি।
রানা প্লাজার পাঁচটি কারখানার একটিতেও ইউনিয়ন ছিল না
৪৫ বছর বয়সী মোহসিনা বেগম ১৮ বছর ধরে পোশাকশিল্পে কাজ করছেন। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি জানিয়েছেন, ওভারটাইমসহ মাসে তাঁর আয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে আট হাজার টাকাই চলে যায় বাসাভাড়ায়। বাকি টাকা দিয়ে পুরো মাসের খরচ চালানো তাঁর জন্য প্রায় অসম্ভব। তাঁর এই হিসাবের মধ্যেই শ্রমিকদের অসন্তোষের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়।
শ্রমিকদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির পাশাপাশি রয়েছে কারখানায় রেশন সুবিধা, ইউনিয়ন করার অধিকার এবং বিনা কারণে ছাঁটাই ও ব্ল্যাকলিস্ট করা বন্ধের দাবি। চাকরি হারানোর ভয়ও অমূলক নয়। ২০২৩ সালের মজুরি আন্দোলনের পর তিনটি শ্রমিক ফেডারেশন অভিযোগ করেছিল, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মালিকপক্ষও কারখানা বন্ধ ও ব্যবসায়িক চাপের কথা বলছে। বিজিএমইএর হিসাবে, গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হওয়া কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা অভিযোগ করেছেন, তাঁরা বকেয়া মজুরি ও ছাঁটাইকালীন পাওনা পাননি। শ্রমিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও নতুন নয়। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে অন্তত ১ হাজার ১৩৪ জনের মৃত্যু হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ওই ভবনে থাকা পাঁচটি কারখানার কোনোটিতেই ট্রেড ইউনিয়ন ছিল না। ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পরও শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলার মতো কার্যকর সংগঠন থাকলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা সহজ হতো, সেই প্রশ্নও তাই গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রেড ইউনিয়ন কীভাবে শ্রমিকের হলো
বাংলাদেশে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও পরিচালনার অধিকার বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর মাধ্যমে স্বীকৃত। ২০২৬ সালের ৪৩ নম্বর আইনের সংশোধনের পর এই আইনি কাঠামোতে আরও কিছু পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে আগে আইনের আওতার বাইরে থাকা কিছু শ্রেণির শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার স্পষ্ট করা হয়েছে।
এই আইনে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন, পরিচালনা এবং নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। এ প্রতিবেদনে ধাপে ধাপে তুলে ধরা হবে কীভাবে একটি ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন করতে হয়, কারা এই অধিকার ভোগ করেন এবং কোন পরিস্থিতিতে নিবন্ধন বাতিল হতে পারে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৭৬ ধারায় শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও তাতে যোগ দেওয়ার মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে। এই অধিকার এখন গৃহকর্মী ও নাবিকদের মতো আগে বাদ পড়া শ্রমিকগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও স্পষ্টভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, শ্রমিকেরা নিজেরাই ট্রেড ইউনিয়নের গঠনতন্ত্র তৈরি করতে পারবেন, স্বাধীনভাবে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবেন এবং ইউনিয়নের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। একইভাবে, নিয়োগকর্তাদেরও নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংগঠন গঠনের অধিকার রয়েছে।
শ্রমিকের অধিকারে ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা
ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা বুঝতে একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়। একজন শ্রমিক একা মালিকের কাছে মজুরি বা ছুটির দাবি জানালে দরকষাকষিতে তাঁর অবস্থান সাধারণত দুর্বল থাকে। কিন্তু কয়েকশ শ্রমিক নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে একসঙ্গে দাবি জানালে পরিস্থিতি বদলে যায়। শ্রমিকদের এই সম্মিলিতভাবে দাবি তোলা ও মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় যৌথ দরকষাকষি।
শ্রমিকদের সংগঠন গড়ে তোলার স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) অন্যতম মৌলিক নীতি। সংগঠনের স্বাধীনতা বিষয়ক ৮৭ নম্বর কনভেনশনের মূল কথা হলো, শ্রমিকেরা আগাম অনুমতি ছাড়াই নিজেদের পছন্দমতো সংগঠন গড়ে তুলতে পারবেন। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের ২২ জুন এই কনভেনশন অনুমোদন করে। দেশের আইন অনুযায়ী, শ্রমিকেরা ইউনিয়ন গঠনের পর শ্রম অধিদপ্তরে নিবন্ধনের আবেদন করেন। নিবন্ধন পেলে ইউনিয়ন আইনি স্বীকৃতি নিয়ে শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলতে পারে। সদস্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ইউনিয়নের বছরে অন্তত একটি সাধারণ সভা করাও বাধ্যতামূলক।
আইন বদলেছে, কিন্তু বাস্তবায়ন কতটা সহজ
ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের নিয়মে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। ২০১৮ সালের আগে কোনো কারখানায় ইউনিয়ন গঠন করতে মোট শ্রমিকের ৩০ শতাংশের সমর্থন প্রয়োজন হতো। পরে তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল সংসদে পাস হওয়া সর্বশেষ আইনে শ্রমিকের নির্দিষ্ট শতাংশের হিসাব তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন কারখানায় শ্রমিকসংখ্যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য থাকলেই নিবন্ধনের আবেদন করা যাবে। ৩০০ জন পর্যন্ত শ্রমিক থাকা প্রতিষ্ঠানে ২০ জন, ৩০১ থেকে ৫০০ জনের প্রতিষ্ঠানে ৪০ জন, ৫০১ থেকে ১ হাজার ৫০০ জনের প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন, ১ হাজার ৫০১ থেকে ৩ হাজার জনের প্রতিষ্ঠানে ৩০০ জন এবং ৩ হাজারের বেশি শ্রমিক থাকলে ৪০০ জন সদস্য হলেই আবেদন করা যাবে।
একই প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ তিনটি ইউনিয়ন গঠনের সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে অধ্যাদেশে এই সংখ্যা ছিল পাঁচটি। শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্ট করা কিংবা মালিকের নিয়ন্ত্রণে ইউনিয়ন গড়ে তোলার মতো কর্মকাণ্ডকে আইনে অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, শ্রম মহাপরিচালক এখন আদালতে না গিয়েও এ ধরনের অন্যায় বন্ধের নির্দেশ দিতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে পারেন। নিবন্ধিত সব ইউনিয়নের জন্য সদস্যদের বেতন থেকে চাঁদা সংগ্রহের সুযোগও রাখা হয়েছে।
নতুন আইনে খাতভিত্তিক দরকষাকষির কাঠামো যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি বিপজ্জনক কাজ প্রত্যাখ্যানের অধিকার, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির অভিযোগ শোনার কমিটি এবং নিরাপত্তা কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতাও এসেছে। ফলে ছাঁটাই, হয়রানি ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার মতো বিষয়ে শ্রমিকদের হাতে আগের তুলনায় বেশি আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এসব অধিকার বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক এখনো আছে।
ইউনিয়ন থাকলে শ্রমিকদের লাভ কতটা
ইউনিয়ন শ্রমিকদের বাস্তব সুবিধা দিতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের ফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ঢাকার আশপাশের তিনটি শিল্পাঞ্চলের ৩ হাজার ৫ জন শ্রমিকের ওপর জরিপ চালিয়েছে। এতে দেখা গেছে, ইউনিয়নের সদস্য শ্রমিকদের মোট মজুরি অন্য শ্রমিকদের তুলনায় গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। তবে এই ফলাফল দিয়ে বলা যায় না যে ইউনিয়নের কারণেই তাঁদের মজুরি বেশি। বড় ও নিয়ম মেনে চলা কারখানায় এমনিতেই মজুরি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
আইএলওর প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কারখানায় ইউনিয়ন গঠনের পর শ্রমিকদের সঙ্গে মৌখিক দুর্ব্যবহার কমেছে। তবে ২০২০ সালের আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, পোশাক ও বস্ত্র খাতে কর্মপরিবেশ উন্নয়নে ইউনিয়নগুলোর প্রভাব উল্লেখযোগ্য নয়। এর একটি কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, ইউনিয়ন নেতারা মূলত মজুরি ও ছুটির মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার কারিগরি দিকগুলোতে তাঁদের ভূমিকা তুলনামূলক কম।
সক্রিয় ইউনিয়ন ১০০টিরও কম
সরকারি হিসাবে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি দেশে নিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৯৩৭টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৮১টি পোশাকশিল্পে। কিন্তু শ্রমিক নেতাদের দাবি, পোশাক খাতে সক্রিয় ইউনিয়ন ১০০টিরও কম। আর মালিকপক্ষের সঙ্গে দরকষাকষির আইনি ক্ষমতা রয়েছে এমন ইউনিয়নের সংখ্যা প্রায় ৪০টি।
শ্রম অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে আইএলও জানিয়েছে, দেশে ৯ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ইউনিয়ন থাকলেও এগুলো মোট শ্রমিকের মাত্র ৫ দশমিক ১ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ইউনিয়নগুলো আবার ১৯০টির বেশি ফেডারেশনে বিভক্ত, যেগুলো ৩৭টি জাতীয় ফেডারেশনের অধীনে রয়েছে। অথচ সব সংগঠনকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার মতো কোনো জাতীয় কনফেডারেশন নেই।
আমার পর্যবেক্ষণ হলো, সমস্যাটি শুধু ইউনিয়নের সংখ্যা কম বা বেশি হওয়ার নয়, সংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাবও বড় বিষয়। অর্থনীতিবিদ অ্যালবার্ট হার্শম্যান মানুষের অসন্তোষ প্রকাশের দুটি পথের কথা বলেছিলেন: একটি হলো অসন্তুষ্ট পরিস্থিতি ছেড়ে চলে যাওয়া, অন্যটি হলো নিজের অবস্থান তুলে ধরে পরিবর্তনের চেষ্টা করা। পোশাকশ্রমিকদের সামনে কর্মক্ষেত্রের ভেতরে দাবি জানানোর নিয়মিত ও কার্যকর সুযোগ দুর্বল হলে তাঁদের অসন্তোষ হয় চাকরি ছেড়ে প্রকাশ পায়, নয়তো রাজপথে আন্দোলনে রূপ নেয়।
এবারের আন্দোলনেও শ্রমিকেরা মজুরি বোর্ডে নিজেদের প্রতিনিধিত্বের দাবি তুলেছিলেন। এক শ্রমিক সংগঠনের নেতা বলেছেন, অক্টোবরে মজুরি বোর্ড গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় শ্রমিকদের ক্ষোভ বেড়েছে। শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তারও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০২৩ সালে মজুরি বোর্ড গঠনের পর প্রথম বৈঠক হতে প্রায় দুই মাস সময় লেগেছিল। এবার প্রথম বৈঠক হয়েছে মাত্র তিন দিনের মধ্যে। এই দ্রুততার পেছনে প্রশাসনের সদিচ্ছা কতটা, আর রাজপথের আন্দোলনের চাপ কতটা কাজ করেছে, তা বিবেচনার বিষয়।
আইন বদলালেও নিবন্ধনের পথে বাধা
নতুন শ্রম আইনের পেছনে আন্তর্জাতিক চাপও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০১৯ সালে আইএলওতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আর্টিকেল ২৬ অনুযায়ী অভিযোগ করা হয়েছিল। অভিযোগে ৮১, ৮৭ ও ৯৮ নম্বর কনভেনশন বাস্তবায়ন না করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। আইএলওর গভর্নিং বডি ২০২৬ সালের মার্চে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে ২০২৭ সালের মার্চের অধিবেশন পর্যন্ত সময় দিয়েছে। ফলে আইন সংশোধনের পর বাস্তবে শ্রমিকদের অধিকার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটিও আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষণে থাকবে।
শ্রম সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইউনিয়ন গঠনের জন্য ন্যূনতম ৫০ জন সদস্যের প্রস্তাব দিয়েছিল। একই সঙ্গে নিবন্ধনের আবেদন ৫৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার সুপারিশ করেছিল। তবে মালিকপক্ষের আপত্তিও রয়েছে। বিজিএমইএর দাবি, ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় ৫০ জন সদস্যের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল, কিন্তু চূড়ান্ত আইনে তা কমিয়ে ২০ জন করা হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এতে কারখানার বাইরের লোকজন ইউনিয়নে যুক্ত হয়ে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এ বিষয়ে তারা ভারতের ১০ শতাংশ বা ন্যূনতম ১০০ জন এবং পাকিস্তানের ২০ শতাংশের নিয়মের উদাহরণও দিয়েছে।
অন্যদিকে, একটি প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ তিনটি ইউনিয়নের সীমা রাখার পক্ষে যুক্তি হলো, অতিরিক্ত ইউনিয়ন গঠনের ফলে বিভক্তি বাড়তে পারে। তবে শ্রমিক নেতাদের একাংশ মনে করেন, এই সীমা শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সংকুচিত করতে পারে। অর্থাৎ আইনটির কিছু বিধান নিয়ে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। দুই পক্ষের যুক্তিই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তবে আইনের চেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এর বাস্তব প্রয়োগ। ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট সলিডারিটি সেন্টারের এক আলোচনায় শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, শ্রম অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা ইউনিয়নের নিবন্ধন আটকে রাখছেন এবং ঘুষ চাইছেন। এগুলো শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, প্রমাণিত তথ্য নয়। তবে ওই আলোচনায় নিবন্ধন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার একটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়। লিবাস নিটওয়্যার শ্রমিক ইউনিয়ন ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর নিবন্ধনের আবেদন করে। শ্রম অধিদপ্তর সেই আবেদন গ্রহণ করে ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ প্রায় ৯৫ দিন পর।
আবেদনের ক্ষেত্রে প্রতিবার মালিকপক্ষের দেওয়া শ্রমিকসংখ্যার সনদ চাওয়ার চর্চা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আইএলওর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিধি ভঙ্গের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি এখন বদলি। নারী শ্রমিক নেতা নাজমা আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ইউনিয়নের নিবন্ধন অনুমোদন পেতে ক্রেতার চাপও কাজ করেছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইএলওর ৮৭ নম্বর কনভেনশন শ্রমিকদের আগাম অনুমতি ছাড়াই সংগঠন গড়ার স্বাধীনতার কথা বলে। কিন্তু নিবন্ধন যদি কর্মকর্তা বা দপ্তরের সিদ্ধান্ত এবং সময়ের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সদস্যসংখ্যার শর্ত কমিয়ে দিলেও সংগঠনের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত হয় না। নতুন আইন এই সমস্যা কতটা দূর করতে পারবে, তা বোঝা যাবে নিবন্ধনের আবেদনে কত দিন লাগছে, কত আবেদন বাতিল হচ্ছে এবং শ্রমিকদের অভিযোগ কত দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে, সেসব তথ্য থেকে।
যারা আইনের পরিধির বাইরে
শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেডে। এসব অঞ্চলের শ্রমিকেরা ট্রেড ইউনিয়নের পরিবর্তে শ্রমিক কল্যাণ সমিতি গঠন করতে পারেন। শ্রম অধিকারকর্মীদের মতে, এসব সমিতির দরকষাকষির ক্ষমতা সীমিত। ২০১৯ সালের ইপিজেড শ্রম আইনও নতুন শ্রম আইনের সঙ্গে সমন্বয় করে সংশোধন করা হয়নি। ২০২৬ সালের জুনেও বিশেষজ্ঞেরা ইপিজেডের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু দিন শেষে ইপিজেড শ্রমিকদের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন না থাকায় এবং পাশাপাশি নতুন শ্রম আইনের সাথে ইপিজেড শ্রম আইন সংশোধন না হওয়ায় তাদের দাবি আদায় কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর বাইরে দেশের শ্রমশক্তির ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন বলে আইনজীবীদের হিসাব। এসব ক্ষেত্রে শ্রম আইনের সুরক্ষা পৌঁছানোও কঠিন। সংশোধিত আইনে গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক, নাবিক ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক শ্রমিকদের কিছু অধিকার যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ন্যূনতম মজুরি ও কর্মঘণ্টার সুরক্ষা এখনো সবার জন্য নিশ্চিত হয়নি।
কার্যকর ইউনিয়নের জন্য যা বদলানো দরকার
সব তথ্য বিশ্লেষণ-বিবেচনার পর মূল্যায়ন দাঁড়ায়, আইনি কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবে সক্রিয় ইউনিয়ন এখনো সীমিতসংখ্যক কারখানায় রয়েছে। ফলে অধিকাংশ শ্রমিকের জন্য ইউনিয়ন এখনো কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধির ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
এই ব্যবধান কমাতে কয়েকটি পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। অনলাইনে আবেদনের অগ্রগতি দেখার ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শ্রম সংস্কার কমিশনের ৫৫ দিনের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির সুপারিশ কার্যকর মানদণ্ড হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ইউনিয়নগুলোকেও নিজেদের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত সভা, সদস্য তালিকা ও আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা এবং নারী শ্রমিকদের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। তৃতীয়ত, ইপিজেডে সংগঠন করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইএলওর সঙ্গে প্রতিশ্রুত সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে। চতুর্থত, নির্দিষ্ট সময় পরপর মজুরি পর্যালোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। মজুরি বোর্ডের কাজ যদি তিন বছর পরপর নিয়মিত হয় এবং সেখানে শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব থাকে, তাহলে প্রতিবার মজুরি নিয়ে রাজপথে নামার প্রয়োজন কমতে পারে।
তবে বিষয়টি শুধু ইউনিয়নের শক্তি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দরকষাকষিতে ইউনিয়নের সক্ষমতা নির্ভর করে শ্রমিকদের ঐক্য এবং মালিকপক্ষের আর্থিক সামর্থ্য, দুইয়ের ওপরই। কারখানা বন্ধ হচ্ছে, রপ্তানি আদেশ কমছে এবং উৎপাদন খরচ বাড়ছে, এমন পরিস্থিতিতে শুধু ইউনিয়নের শক্তি বাড়ালেই মজুরি বাড়ানো সম্ভব হবে না। এ জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি, উৎপাদন ব্যয়ের তথ্য স্বচ্ছভাবে ভাগ করা এবং খাতভিত্তিক আলোচনার সুযোগ বাড়ানোও জরুরি। নতুন আইনে যুক্ত হওয়া খাতভিত্তিক দরকষাকষির কাঠামো এ ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে।
এবারের আন্দোলন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানির অভিযোগ করেছেন। আশুলিয়ায় উসকানির অভিযোগে কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে আটকের খবরও এসেছে। অন্যদিকে শ্রমিকপক্ষের দাবি, মজুরি বোর্ড গঠনে দেরি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিই আন্দোলনের মূল কারণ। কোন বক্তব্য কতটা সত্য, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে একটি সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রাখা দরকার, শুধু আইন বদলালে বা ইউনিয়ন শক্তিশালী হলেই মজুরি বাড়বে না। মালিকপক্ষের সামর্থ্য, ক্রেতাদের দর এবং রপ্তানি আদেশের অবস্থাও বড় ভূমিকা রাখে। তাই ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি ও উৎপাদন ব্যয়ের তথ্য স্বচ্ছভাবে ভাগ করার ব্যবস্থাও এই সংস্কারের অংশ হওয়া উচিত।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন মজুরি কাঠামো কত টাকা নির্ধারণ করবে, তা নয়। আরও বড় চিন্তার হলো, পরের বছর একই দাবিতে শ্রমিকদের আবার রাস্তায় নামতে হবে কি না। সেটি অনেকটাই নির্ভর করবে কারখানার ভেতরে নিজেদের কথা বলার জন্য শ্রমিকেরা কত সহজে ইউনিয়ন গঠন করতে পারেন এবং সেই ইউনিয়ন তাঁদের হয়ে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তার ওপর।
জয়দীপ এলিন রিসার্চার (লিগ্যাল)
রাকিবুল ইসলাম রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

