পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডে উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তর নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একাধিকবার কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বড় অঙ্কের শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা প্রচলিত আইন ও বাজার বিধিমালার পরিপন্থী। এতে বাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অন্তত দুবার পরিচালকদের শেয়ার স্থানান্তর হয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ বা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আগে থেকে জানানো হয়নি। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা বা পরিচালকরা শেয়ার বিক্রি বা হস্তান্তরের আগে নির্ধারিত পদ্ধতিতে ঘোষণা দিতে বাধ্য। এই নিয়মের উদ্দেশ্য হলো বাজারে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এমন গোপন লেনদেন পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলার জন্য বড় ধরনের হুমকি। কারণ, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন, অথচ গুরুত্বপূর্ণ শেয়ার পরিবর্তনের তথ্য গোপন রাখা হলে তারা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যান।
শেয়ার কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংকটির মোট শেয়ারের বড় অংশই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। ফলে এই অনিয়মের সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরও উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে, তবে নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারিত্বের পরিবর্তন নিয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে পরিচালকদের হাতে থাকা শেয়ারের হার কমে যায়, যা থেকে ধারণা করা হয় বড় অঙ্কের শেয়ার হস্তান্তর হয়েছে। পরবর্তীতে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার শেয়ারধারণের হার বেড়ে যায়। এই ওঠানামা সত্ত্বেও কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকায় বিষয়টি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
বিধিমালা অনুযায়ী, শেয়ার কেনাবেচা বা হস্তান্তরের ইচ্ছা লিখিতভাবে স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানাতে হয় এবং তা বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকাশ করতে হয়। এই প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা হলে তা সরাসরি আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, পরিচালনা পর্ষদে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতির কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তবে তারা সতর্ক করেছেন, প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত না করা গেলে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
ন্যাশনাল ব্যাংক একসময় দেশের ব্যাংকিং খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণসংক্রান্ত জটিলতা এবং ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান দুর্বল হয়েছে। এর প্রতিফলন শেয়ারবাজারেও দেখা যাচ্ছে, যেখানে ব্যাংকটির শেয়ার দীর্ঘদিন ধরে অভিহিত মূল্যের নিচে লেনদেন হচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ছোটখাটো লেনদেনও কঠোরভাবে নজরদারির আওতায় থাকে, সেখানে বড় প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ না হলে তা ‘দ্বৈত নীতি’ হিসেবে দেখা হয়। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায় এবং বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখা হবে।

