দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পথে এগোচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, যেসব মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড দীর্ঘদিন ধরে নিট সম্পদমূল্যের তুলনায় বড় ছাড়ে লেনদেন হচ্ছে, সেগুলোকে বেমেয়াদি ফান্ডে রূপান্তর অথবা অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট অভিহিত মূল্য ও নিট সম্পদমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে লেনদেন হচ্ছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছিলেন না। নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই সংকট কাটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে কার্যকর হওয়া মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো স্কিমের ইউনিটপ্রতি গড় বাজারদর যদি ক্রয়মূল্য অথবা ঘোষিত নিট সম্পদমূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, তার তুলনায় ২৫ শতাংশ বা তার বেশি কমে যায়, তাহলে সেই ফান্ড নিয়ে বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এক্ষেত্রে ইউনিটহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে ফান্ডকে বেমেয়াদি কাঠামোয় রূপান্তর অথবা অবসায়ন করা যাবে।
নতুন বিধান বাস্তবায়নের সময়সীমা পূর্ণ হতে যাচ্ছে আগামী ১২ মে। এরপর এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টিদের রেকর্ড ডেট ঘোষণা করতে হবে। অর্থাৎ আগামী জুনের মধ্যেই বেশ কয়েকটি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, ফান্ডের রূপান্তর বা অবসায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ইউনিটহোল্ডারদের বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজন করতে হবে। সভায় উপস্থিত ভোটদাতা ইউনিটহোল্ডারদের অন্তত তিন-চতুর্থাংশ সমর্থন পেলে ফান্ডকে বেমেয়াদিতে রূপান্তর করা যাবে। অন্যথায় অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার সর্বশেষ নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ আর বাড়ানো যাবে না। তবে চাইলে এগুলোকে বেমেয়াদি ফান্ডে রূপান্তর করা যাবে। এই রূপান্তরকে ফান্ডের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো সম্পদ ব্যবস্থাপক ফান্ড রূপান্তরের প্রস্তাব দিলে সেটি ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন নিতে হবে। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রেকর্ড ডেট ঘোষণা এবং ইউনিটহোল্ডারদের সভা আয়োজন করতে হবে। রেকর্ড ডেট ঘোষণার পর থেকে সংশ্লিষ্ট ফান্ডের ইউনিট লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে।
রূপান্তর কার্যকর হলে ফান্ডের সম্পদ ও দায় ট্রাস্টির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। একই সঙ্গে একজন স্বতন্ত্র নিরীক্ষকের মাধ্যমে ফান্ডের সম্পদ মূল্যায়ন করা হবে। সেই প্রতিবেদন কমিশনের কাছে জমা দিতে হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে। কারণ বেশিরভাগ মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড দীর্ঘদিন ধরেই বড় ডিসকাউন্টে লেনদেন হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত সম্পদমূল্যের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বেমেয়াদি ফান্ডে রূপান্তর হলে বিনিয়োগকারীরা নিট সম্পদমূল্যের ভিত্তিতে নতুন ইউনিট পাবেন। এতে বর্তমানে বাজারদরের তুলনায় বেশি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীরা চাইলে ইউনিট নগদায়নের সুযোগও পাবেন।
তবে বাজারের একাংশের আশঙ্কা, সব ফান্ড রূপান্তরে সফল না হলে কিছু ফান্ডের অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদে বাজারে কিছু অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এটি মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডই নিট সম্পদমূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ছাড়ে লেনদেন হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এবং বাজারকে কার্যকর রাখতে এই রূপান্তর প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

