দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী চাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত উৎপাদন ও সেবামুখী কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থায়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির আয় ও মুনাফায় বড় ধরনের নেতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়েছে, আবার অনেকের মুনাফা কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন ও সেবাসংশ্লিষ্ট ২৩১টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ৫৪টি প্রতিষ্ঠান চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে লোকসানের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে মুনাফায় থাকলেও ৫৭টি কোম্পানির আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ কোম্পানি আর্থিক চাপ, দুর্বল ব্যবসা পরিবেশ কিংবা কার্যক্রম সংকটে রয়েছে।
এ ছাড়া ৬৪টি কোম্পানি এখনো কোনো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান নামমাত্র কার্যক্রম চালাচ্ছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতে অনিয়মের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হওয়া কয়েকটি কোম্পানির প্রকৃত ব্যবসায়িক ভিত্তি দুর্বল থাকায় এখন সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে বেশিরভাগ কোম্পানি লোকসানের পেছনে একই ধরনের কারণ তুলে ধরেছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি সংকটকে দায়ী করছে উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো।অনেক কোম্পানি জানিয়েছে, ডলার সংকটের কারণে সময়মতো এলসি খোলা সম্ভব হয়নি। এতে কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং স্থানীয় বাজার থেকে বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং মুনাফা কমেছে।
দেশবন্ধু পলিমার জানিয়েছে, কাঁচামাল সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে তারা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারেনি। মেঘনা সিমেন্ট বলেছে, আমদানি জটিলতায় স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি মূলত কনভার্সন ইনকামের ওপর নির্ভর করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধি উৎপাদন খরচ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছে মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ। একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছে গ্লোবাল হেভি কেমিক্যালসও। অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার আর্থিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে জানিয়েছে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার ও বসুন্ধরা পেপার মিলস। ব্যাংকঋণের সুদ বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক কোম্পানির নিট মুনাফা চাপে পড়েছে।
দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে ভোক্তা পর্যায়েও। সিঙ্গার বাংলাদেশ জানিয়েছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ইলেকট্রনিক পণ্যের বিক্রি কমেছে। মুন্নু সিরামিকসের মতে, মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ছুটির কারণে কর্মদিবস কমে যাওয়ায় উৎপাদন ও বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু কোম্পানি আবার কার্যক্রম প্রায় বন্ধ রেখেই আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। মিথুন নিটিং জানিয়েছে, কারখানা বন্ধ থাকায় তাদের কোনো আয় হয়নি।
তবে সামগ্রিক নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো মুনাফা করেছে। অন্তত ৩০টি কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় পাঁচ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪৪ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। বারাকা পাওয়ার জানিয়েছে, সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে আয় বাড়ায় তাদের মুনাফা বেড়েছে। একইভাবে বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়জনিত লোকসান কমে যাওয়ায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।
জ্বালানি খাতের সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রি বাড়া ও কাঁচামালের দাম কমার সুবিধা পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি গত বছরের লোকসান কাটিয়ে বড় মুনাফা করেছে। প্রকৌশল খাতের আনোয়ার গ্যালভানাইজিং জানিয়েছে, পরিচালন বহির্ভূত আয় বাড়ার কারণে তারা লোকসান কাটিয়ে মুনাফায় ফিরেছে।
মুনাফার পরিমাণে ওষুধ খাতের স্কয়ার ফার্মা সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দুই হাজার কোটি টাকার বেশি নিট মুনাফা করেছে। স্টিল খাতের বিএসআরএম লিমিটেড ও বিএসআরএম স্টিলও উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। বিদ্যুৎ খাতের পাওয়ার গ্রিডের মুনাফা ৫৭০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
এদিকে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বেশ কিছু কোম্পানি এখনো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি। এ তালিকায় রয়েছে জিপিএইচ ইস্পাত, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, ফ্যামিলি টেক্স, জেনারেশন নেক্সট, বেক্সিমকো ফার্মা, কেয়া কসমেটিকস ও মারিকো বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠান। বিশ্লেষকদের মতে, সামষ্টিক অর্থনীতির চাপে শিল্প ও সেবা খাতের বড় অংশ এখন প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে। উৎপাদন ব্যয়, ঋণের চাপ এবং দুর্বল চাহিদার এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলে পুঁজিবাজারে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

