দেশের পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ভিত্তি শক্তিশালী করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি তিন ধাপে বিস্তৃত সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তৈরি এই রূপরেখায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) আরও স্বায়ত্তশাসিত করা, তদন্ত কমিশন গঠন এবং বাজারে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কমিশন গঠন করা হবে। পাশাপাশি বাজারে বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম ও কারসাজি তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন এবং সার্বিক সংস্কারের জন্য পৃথক সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ সময় জেলা পর্যায়ে বিনিয়োগ কেন্দ্র স্থাপন, প্রবাসীদের জন্য সহজ বিনিয়োগ সুযোগ তৈরি এবং তরুণদের জন্য দেশব্যাপী আর্থিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে বাজারকে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা।
মধ্যমেয়াদে আগামী অর্থবছরের মধ্যে বিএসইসিকে কার্যত স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাজার তদারকিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে কারসাজি, অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার ও অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
এই পর্যায়ে করনীতি সংস্কার, করপোরেট গভর্নেন্স জোরদার এবং বিনিয়োগকারীদের অদাবীকৃত অর্থ বা শেয়ার ফেরত দেওয়ার জন্য পৃথক তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ‘পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা তহবিল আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছে, যা বাজারে আস্থা ফেরাতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে নীতিনির্ধারকরা।
শিক্ষা খাতেও পুঁজিবাজার সংক্রান্ত জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থা ও বিনিয়োগ শিক্ষা পাঠ্যসূচিতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে পাঁচ বছরের রূপরেখায় পুঁজিবাজারে কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে শক্তিশালী শেয়ার, বন্ড ও ইক্যুইটি বাজার গড়ে তোলা, করপোরেট বন্ডের পরিসর বাড়ানো এবং ধাপে ধাপে এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড, সুকুক ও সবুজ বন্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার সবুজ বন্ড ইস্যুর লক্ষ্যও রাখা হয়েছে, যা জলবায়ু সহনশীল প্রকল্পে অর্থায়নের উৎস হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ব্লকচেইন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে পৃথক অনলাইন পোর্টাল চালুর কথাও বলা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সহজে বাজারে অংশ নিতে পারেন।
স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য দ্রুত তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি করতে ‘ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস’ চালুর প্রস্তাবও রয়েছে, যেখানে মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
বাজার নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়ম দমনে পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সরাসরি মামলা দায়েরের বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা ব্যবস্থা ও দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির কাঠামো তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কার্যকর বাস্তবায়নই এই সংস্কারের সফলতার মূল চাবিকাঠি হবে।

