দেশের শেয়ারবাজারকে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, আস্থাহীনতা ও অনিয়মের চক্র থেকে বের করে আনতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যাপক সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার আওতায় নতুন আইন প্রণয়ন, বাজার তদারকিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠন এবং নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে, পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ফিরে আসবে।
বাজারসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শুধুমাত্র আইন পরিবর্তন করলেই পুঁজিবাজারের সব সমস্যা দূর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং ভালো আর্থিক ভিত্তির কোম্পানির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বাজারে কারসাজির সুযোগ কমিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে শেয়ারবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের সংস্কার কমিশন গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কমিশন অতীতের বিভিন্ন অনিয়ম, শেয়ারমূল্য কারসাজি, তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির কারণগুলো খতিয়ে দেখবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাজারকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য সুপারিশও দেবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাজারে নজরদারি জোরদার করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও কাজ করছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অস্বাভাবিক লেনদেন, ইনসাইডার ট্রেডিং এবং সম্ভাব্য কারসাজির ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বাজারে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংস্কার পরিকল্পনার আরেকটি বড় অংশ হলো বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা। বর্তমানে শেয়ারকেন্দ্রিক বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বন্ড, সুকুক, সবুজ বন্ড, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডসহ বিভিন্ন আর্থিক পণ্যের প্রসার ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি ভাগাভাগির আরও সুযোগ পাবেন এবং বাজারের গভীরতাও বাড়বে।
বাজারসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের ওপর বাজার বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে গুজব ও আবেগভিত্তিক সিদ্ধান্তের কারণে অস্থিরতা তৈরি হয়। ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান, মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে বাজার আরও স্থিতিশীল হবে।
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নতুন আইনি কাঠামো তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে। দাবিহীন লভ্যাংশ ও শেয়ার সংরক্ষণের জন্য পৃথক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন বিধিমালার কথাও বিবেচনায় রয়েছে।
সরকারি পর্যায়ে শেয়ারবাজারকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে বাজারে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে বাজারে মানসম্মত শেয়ারের সংখ্যা বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বিকল্প বিনিয়োগ সুযোগ তৈরি হবে।
সাম্প্রতিক এক বাজার-মনোভাব জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী আগামী সময়ে বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির বিষয়ে আশাবাদী। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সুশাসনের ঘাটতি এবং কারসাজিকে এখনো বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগকে বাজারে আস্থা ফেরানোর প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়, বরং সমন্বিত ও ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন। নতুন আইন, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ একসঙ্গে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজার নতুন করে গতি পেতে পারে। সেই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পথও আরও সুগম হবে।

