ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির পর দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। ছুটি শেষে প্রথম কার্যদিবসেই অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধির ফলে প্রধান শেয়ারবাজারে সূচক ও লেনদেন—উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিলছে, যা সাম্প্রতিক ধারাবাহিক উত্থানকে আরও গতিশীল করেছে।
সোমবার ঢাকা শেয়ারবাজারে প্রধান মূল্যসূচক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে ৫ হাজার ৩৭০ পয়েন্টের ওপরে অবস্থান নেয়। এর আগে ঈদের ছুটির পূর্ববর্তী কয়েকটি কার্যদিবসেও বাজার ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ফলে ছুটির পরও সেই ধারা অব্যাহত থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
শুধু সূচক নয়, বাজারে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। দিনভর প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি শেয়ার ও ইউনিট কেনাবেচা হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রতিফলন।
ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং পুঁজিবাজার সংস্কারের ঘোষণাগুলো বাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে শেয়ারবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে সরকারের অবস্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শেয়ারবাজারকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করার যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা বাজার অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন, আসন্ন জাতীয় বাজেটেও পুঁজিবাজারবান্ধব কিছু পদক্ষেপ থাকতে পারে।
দিনের লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ খাতেই শেয়ারদর বৃদ্ধির প্রবণতা ছিল। বিশেষ করে ব্যাংক, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, সিমেন্ট এবং উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি ছিল। এর মধ্যে প্রকৌশল ও ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে।
অন্যদিকে কিছু খাতে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা এবং চামড়াভিত্তিক কিছু কোম্পানির শেয়ারে বিক্রির চাপ লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরবানির মৌসুমে চামড়ার বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
দিন শেষে বাজারে দরবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির সংখ্যা দরপতন হওয়া কোম্পানির তুলনায় বেশি ছিল। যদিও বাজারের শীর্ষ দরবৃদ্ধিকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি দুর্বল আর্থিক অবস্থার বা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির প্রতিষ্ঠানও ছিল। এ কারণে বাজার বিশ্লেষকরা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
তাদের মতে, শুধুমাত্র স্বল্পমেয়াদি দরবৃদ্ধির কারণে কোনো শেয়ারে বিনিয়োগ না করে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি, ব্যবসার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনা করা উচিত। কারণ মৌলভিত্তি দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে অতিরিক্ত জল্পনা-কল্পনা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সোমবারের বাজারচিত্র থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—ঈদের ছুটির পরও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমেনি। বরং বাজারে ইতিবাচক প্রত্যাশা এবং সংস্কারমুখী আলোচনার কারণে লেনদেন ও সূচক উভয়ই ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে নীতিগত সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাজারে আস্থার ধারাবাহিকতার ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির বাস্তবায়ন জরুরি। এসব উদ্যোগ সফল হলে শেয়ারবাজার দেশের অর্থনীতিতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

