দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা কাটিয়ে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সংস্থাটিতে নতুন চেয়ারম্যান এবং চারজন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মঙ্গলবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এ তথ্য জানান। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের পুঁজিবাজারকে একটি আধুনিক, কার্যকর এবং বিনিয়োগবান্ধব প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের নেতৃত্বে নতুন কমিশন গঠন করা হচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা বিবেচনার পরিবর্তে পেশাগত দক্ষতা ও বাজার-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যারা মূলধন বাজারের বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন, তাদেরই দায়িত্ব দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, নতুন কমিশনের অধীনে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনেক শক্তিশালী ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে আসতে অনাগ্রহী ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিবর্তনের কারণে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। অনেক উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে।
তার মতে, একটি কার্যকর পুঁজিবাজার দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি শেয়ার ও বন্ডের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী দেশের পুঁজিবাজারের আধুনিকায়নের ইতিহাসও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একসময় কাগুজে শেয়ার সনদ নিয়ে নানা ধরনের জালিয়াতি ও অনিয়ম ছিল। একই শেয়ার একাধিকবার বিক্রি কিংবা বন্ধক রাখার মতো ঘটনাও ঘটত। এসব সমস্যা দূর করতেই শেয়ার লেনদেনকে ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি স্মরণ করেন, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) প্রতিষ্ঠার সময় নানা বাধা ও সংশয় মোকাবিলা করতে হয়েছিল। তবে বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন ব্যবস্থার ফলে বাজার অনেক বেশি স্বচ্ছ ও গতিশীল হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বছরের পর বছর অনিয়ম, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং আর্থিক অপব্যবহারের কারণে অনেক ব্যাংক মূলধন সংকটে পড়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতির মুখে পড়েছেন অসংখ্য বিনিয়োগকারী। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বৈশ্বিক বিনিয়োগ তহবিলগুলোর সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি), বিভিন্ন বৈশ্বিক ফান্ড ম্যানেজার এবং বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তাদের আগ্রহ ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং পুঁজিবাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে উঠলে শিল্প ও ব্যবসা খাতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বড় অংশ সেখান থেকেই আসবে।
একই অনুষ্ঠানে তিনি দেশের বৈদ্যুতিক যানবাহন শিল্পের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। তার দাবি, স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং সরকার এ খাতকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। ভবিষ্যতে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব যানবাহন বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে যাত্রা সহজ নয়। তবে কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং শক্তিশালী আর্থিক খাত গড়ে তোলার মাধ্যমে সরকার সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে।

