চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর শক্তিশালী মুনাফা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর ইতিবাচক প্রভাবে মে মাসজুড়ে দেশের পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেন—দুই ক্ষেত্রেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের শেয়ারের প্রতি নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হওয়ায় বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মে মাসের শুরুটা অবশ্য পুঁজিবাজারের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। লভ্যাংশ ঘোষণা না করায় তালিকাভুক্ত ১৩টি ব্যাংককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। এর ফলে বাজারে সাময়িক নেতিবাচক মনোভাব দেখা দেয়। তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে অধিকাংশ ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য মুনাফা প্রকাশিত হওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা আবারও ব্যাংক খাতের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন।
সদ্য সমাপ্ত মে মাসে দেশের প্রধান শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৩৩৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে। একই সময়ে বড় ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো নিয়ে গঠিত সূচকও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বাজারে দৈনিক গড় লেনদেন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩৬ কোটি টাকায়, যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ বেশি। এ সময় অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে, যা বাজারে ক্রেতাদের সক্রিয় উপস্থিতিরই প্রতিফলন।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মে মাসে ব্যাংক খাতের শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণে প্রধান সূচকে প্রায় ২২ পয়েন্ট যোগ হয়েছে। ওষুধ ও রসায়ন খাত সূচকে ২৪ পয়েন্ট এবং প্রকৌশল খাত ১৭ পয়েন্ট অবদান রেখেছে। একক কোম্পানির মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে। শুধু এই ব্যাংকের শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণে সূচকে প্রায় ২৪ পয়েন্ট যুক্ত হয়েছে। এছাড়া বেক্সিমকো ফার্মা ও সিটি ব্যাংকের শেয়ারও সূচক বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
ব্যাংক খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের নতুন আগ্রহের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মুনাফার শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে বেশ কয়েকটি ব্যাংক বিনিয়োগ আয় বৃদ্ধি এবং কার্যক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করেছে।
এই সময়ে ব্র্যাক ব্যাংকের নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে ৫৭৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সিটি ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে প্রায় ১৬২ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ২৪১ কোটি টাকায়। অন্যদিকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মুনাফা প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২৬১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এসব তথ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
খাতভিত্তিক শেয়ারদরের বৃদ্ধিতে মে মাসে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল পাট খাত। এ খাতের শেয়ারের গড় মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ২১ শতাংশের বেশি। এছাড়া সিরামিক ও ভ্রমণ-অবকাশ খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। পৃথক কোম্পানির হিসাবে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে মেঘনা পেটের শেয়ারে। এছাড়া আরডি ফুড ও নাহি অ্যালুমিনিয়ামের শেয়ারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
লেনদেনের দিক থেকে বীমা খাত ছিল সবচেয়ে সক্রিয়। মে মাসে মোট লেনদেনের ১৫ শতাংশের বেশি হয়েছে এই খাতে। এরপর অবস্থান ছিল প্রকৌশল এবং ওষুধ ও রসায়ন খাতের। পৃথক কোম্পানির হিসাবে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমসের শেয়ারে। এনসিসি ব্যাংক ও মুন্নু সিরামিকসও লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে শুধু ব্যাংকগুলোর মুনাফাই নয়, কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তও ভূমিকা রেখেছে। বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করতে নির্দিষ্ট কিছু প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা শিথিল করায় বাজারে আস্থা বেড়েছে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার উদ্যোগ এবং বাজারবান্ধব পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে।
তাদের মতে, ১৩টি ব্যাংক ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে যাওয়ার কারণে যে ধাক্কা তৈরি হয়েছিল, তা ভালো আর্থিক ফলাফলের কারণে অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন আবারও শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি থাকা ব্যাংকগুলোর শেয়ারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার মে মাসে ইতিবাচক অবস্থানে ছিল। এশিয়ার কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বাজারে ইতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে। বিপরীতে ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা, আগামী দিনগুলোতে পুঁজিবাজারের গতি-প্রকৃতি অনেকাংশে নির্ভর করবে জাতীয় বাজেট, অর্থনৈতিক নীতিমালা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের ওপর। তবে ব্যাংক খাতের মুনাফা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তা পুঁজিবাজারে নতুন আস্থার ভিত্তি তৈরি করতে পারে এবং দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বাজারকে আরও সক্রিয় করে তুলতে সহায়ক হবে।

