দেশের শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এক্মি ল্যাবরেটরিজের প্রয়াত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান সিনহার রেখে যাওয়া শেয়ার দুই সন্তানের মধ্যে সমানভাবে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শেয়ারবাজারের বর্তমান মূল্য অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই শেয়ারের বাজারমূল্য কয়েক দশক কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা বিনিয়োগ মহলে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ মে মিজানুর রহমান সিনহার মৃত্যুর পর তার মালিকানাধীন ৮৫ লাখ ৭৪ হাজার শেয়ার দুই মনোনীত উত্তরসূরির নামে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান নিয়ম অনুসারে এই হস্তান্তর স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়মিত লেনদেনের বাইরে অফ-মার্কেট পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে।
শেয়ারগুলো সমানভাবে ভাগ হলে কোম্পানির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসনিম সিনহা পাবেন ৪২ লাখ ৮৭ হাজার শেয়ার। একই পরিমাণ শেয়ার পাবেন কোম্পানির পরিচালক তানভীর সিনহাও। ফলে পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে কোম্পানির মালিকানা কাঠামোয় তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
বাজারদরের হিসাবে এ শেয়ারের আর্থিক মূল্য অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। বুধবার বেলা পর্যন্ত কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের বাজারদর ছিল ৭৭ টাকা ৮০ পয়সা। সে হিসাবে প্রয়াত উদ্যোক্তার মোট শেয়ারের বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার বেশি। এর ফলে দুই উত্তরাধিকারী প্রত্যেকে প্রায় ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকার শেয়ারের মালিক হতে যাচ্ছেন।
তবে হিসাবের আরেকটি দিকও রয়েছে। কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য বা ফেস ভ্যালু ১০ টাকা হওয়ায় কাগজে-কলমে মোট শেয়ারের মূল্য প্রায় ৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে প্রত্যেকের অংশ প্রায় ৪ কোটি ২৮ লাখ টাকার কিছু বেশি। কিন্তু বাস্তবে শেয়ারধারীরা বাজারমূল্য অনুসারেই সম্পদের মালিক হিসেবে বিবেচিত হন। ফলে উত্তরাধিকারীদের জন্য প্রকৃত আর্থিক মূল্যায়নে বাজারদরই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এক্মি ল্যাবরেটরিজ বাংলাদেশের ওষুধ খাতের অন্যতম শক্তিশালী কোম্পানি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রেখেছে। ২০১৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত মুনাফা ও আকর্ষণীয় নগদ লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে ৩০ শতাংশের বেশি নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি নির্ভরযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে।
সর্বশেষ তিন অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি শক্তিশালী আর্থিক পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। ২০২৩ সালে ৩৩ শতাংশ এবং পরবর্তী দুই বছরে ৩৫ শতাংশ করে নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে। এটি কোম্পানিটির নগদ প্রবাহ ও লাভজনক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেও কোম্পানির ব্যবসায়িক অগ্রগতি ইতিবাচক রয়েছে। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়িয়েছে ৯ টাকা ৪০ পয়সা, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে এক্মি ল্যাবরেটরিজের মোট শেয়ারসংখ্যা ২১ কোটির বেশি এবং বাজারমূলধন ১ হাজার ৬০০ কোটিরও বেশি টাকায় অবস্থান করছে। শেয়ার মালিকানার কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উদ্যোক্তা ও পরিচালক শ্রেণির হাতে এখনো কোম্পানির উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও যথেষ্ট শক্তিশালী।
গত পাঁচ বছরের আর্থিক ফলাফল কোম্পানিটির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে। মহামারি, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট, ডলারের চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি শতকোটি টাকার বেশি নিট মুনাফা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০২১ সালে যেখানে কোম্পানির নিট মুনাফা ছিল প্রায় ১৫৭ কোটি টাকা, সেখানে পরবর্তী কয়েক বছরে তা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালে রেকর্ড ২৪৬ কোটিতে পৌঁছে। সর্বশেষ বছরেও প্রায় ২৪৩ কোটি টাকার মুনাফা ধরে রেখে কোম্পানিটি ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতার প্রমাণ দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিজানুর রহমান সিনহার শেয়ার হস্তান্তর শুধু একটি উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া নয়; এটি কোম্পানির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, মালিকানা কাঠামো এবং করপোরেট পরিচালনায়ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে যেহেতু শেয়ারগুলো পরিবারের ভেতরেই স্থানান্তর হচ্ছে, তাই কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিক কোনো বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করছে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, স্থিতিশীল মুনাফা এবং শক্তিশালী করপোরেট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি কোম্পানি কীভাবে উদ্যোক্তা ও শেয়ারধারীদের জন্য বিপুল সম্পদ তৈরি করতে পারে।

