দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা, দুর্বল লেনদেন, সুশাসনসংকট এবং বিনিয়োগকারীদের হতাশার মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারের হাল ধরলেন নতুন চেয়ারম্যান। দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সামনে সহজ কোনো পথ নেই। বরং বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তোলার জন্য কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেওয়া এক বার্তায় মাসুদ খান বলেছেন, দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে একটি সংকটময় সময় অতিক্রম করছে। এই পরিস্থিতিতে বাজারের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ যেমন সম্মানের, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় দায়িত্ব ও কঠিন চ্যালেঞ্জ।
৪ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের দিনই তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি শুভাকাঙ্ক্ষী, সহকর্মী ও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
তার মতে, বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন। দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে অনিশ্চয়তা, শেয়ারমূল্যের অস্বাভাবিক ওঠানামা এবং কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের অভাবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ আস্থা হারিয়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহও প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না।
তিনি বলেন, শুধু বাজারে সাময়িক গতি ফিরিয়ে আনাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও টেকসই কাঠামো তৈরি করা, যেখানে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বোধ করবেন এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগে উৎসাহ পাবেন।
নতুন চেয়ারম্যান স্বীকার করেছেন, এই দায়িত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্ত তার জন্য সহজ ছিল না। দীর্ঘ করপোরেট জীবনে প্রতিষ্ঠিত অবস্থান, আর্থিক সুবিধা এবং পেশাগত নিরাপত্তা ছেড়ে জনস্বার্থে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে তাকে। তবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থ এবং জাতীয় দায়িত্ববোধই তাকে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে উৎসাহিত করেছে।
তার ভাষায়, অনেক শুভানুধ্যায়ী তাকে আগেই সতর্ক করেছিলেন যে পুঁজিবাজার সংস্কার একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব। অতীতের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, এই খাতে প্রত্যাশা অনেক বেশি হলেও বাস্তব পরিবর্তন আনতে সময় লাগে। তবুও তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
পুঁজিবাজার উন্নয়নের জন্য তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাজারে আরও ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি আনা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, করপোরেট সুশাসন জোরদার করা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
একই সঙ্গে তিনি ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা বাজারের কার্যকারিতা বাড়াবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা গ্রহণ সহজ করবে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা ও আর্থিক জ্ঞান বাড়ানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। যেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন সেখানে তা নিশ্চিত করা হবে, তবে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা দূর করে নিয়মকানুনকে আরও সহজ ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তার ঘোষিত নীতি হলো—প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ, আর সম্ভব হলে সরলীকরণ।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন চেয়ারম্যান এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন দেশের পুঁজিবাজারে বহু বছরের জমে থাকা সমস্যা একসঙ্গে দৃশ্যমান। বাজারে ভালো কোম্পানির স্বল্পতা, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বাজারের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও পুঁজিবাজার সেই অনুপাতে বিস্তৃত হয়নি। দেশের বড় বড় কোম্পানির অনেকেই এখনো শেয়ারবাজারে আসেনি। ফলে বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত রয়েছে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও প্রত্যাশার তুলনায় কম।
তাদের মতে, আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, দৃশ্যমান সংস্কার প্রয়োজন। বাজারে কারসাজি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি।
মাসুদ খানও তার বক্তব্যে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কমিশন একা পুঁজিবাজারের সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। বিনিয়োগকারী, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক, নীতিনির্ধারক, পেশাজীবী সংগঠন এবং গণমাধ্যম—সব পক্ষের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেছেন, গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শকে স্বাগত জানানো হবে। বাজারসংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যা বিনিয়োগকারী এবং জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারের সামনে এখন দুটি বড় লক্ষ্য রয়েছে—বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনীতির জন্য কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে বাজারকে গড়ে তোলা। নতুন চেয়ারম্যানের বক্তব্যে সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট হলেও শেষ পর্যন্ত সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
তাদের ভাষ্য, দেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকট কাটাতে শক্ত নেতৃত্ব, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য। যদি ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তব রূপ পায়, তাহলে বাজারে নতুন আস্থা সৃষ্টি হতে পারে। আর সেই আস্থা ফিরতে শুরু করলে বিনিয়োগ, মূলধন সংগ্রহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে নতুন চেয়ারম্যানের প্রথম বার্তা পুঁজিবাজারের বাস্তব সংকটকে স্বীকার করার পাশাপাশি পরিবর্তনের অঙ্গীকারও তুলে ধরেছে। এখন বিনিয়োগকারীসহ পুরো বাজারের নজর থাকবে—কঠিন পথের কথা বলা এই নেতৃত্ব সেই পথ পাড়ি দিতে কতটা সফল হয়।

