২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য প্রত্যাশিত কর সুবিধা বা বিশেষ প্রণোদনা না থাকলেও বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে। তাদের মতে, তাৎক্ষণিক সুবিধার পরিবর্তে এবার সরকার পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, কাঠামোগত সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে বাজারকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সহায়ক হতে পারে।
বহু বছর ধরে দেশের শেয়ারবাজার নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা, কমে যাওয়া লেনদেন, ভালো কোম্পানির অনুপস্থিতি এবং নতুন বিনিয়োগ পণ্যের সংকট বাজারকে দুর্বল করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় এবারের বাজেটকে অনেকেই একটি নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দর্শনের সফল বাস্তবায়ন হলে দেশের পুঁজিবাজার নতুন মাত্রা পেতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের অর্থায়নে ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের আর্থিক ভারসাম্যে চাপ সৃষ্টি করেছে।
বাজেটে করপোরেট বন্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক, মিউচুয়াল ফান্ডসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উপকরণের সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকার প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য পৌর বন্ড চালুর পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়বে এবং বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।
এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও প্রক্রিয়াকে সহজ, দ্রুত এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা। বর্তমানে একটি কোম্পানির বাজারে তালিকাভুক্ত হতে দীর্ঘ সময় ও জটিল প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। সরকার সেই বাধাগুলো কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। অনলাইনে আবেদন, যাচাই-বাছাই এবং অনুমোদন কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা বাজারে নতুন ও ভালো মানের কোম্পানি আনতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়েও বাজেটে কিছু ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও শেয়ার বিক্রির অর্থ দ্রুত প্রত্যাবাসনের সুবিধা দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারের বর্তমান সংকট কাটাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বৃহৎ দেশীয় করপোরেট গ্রুপ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনতে পারলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু কর সুবিধা নয়, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং সহজতর তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বাজার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের ব্যবধান বাড়ানো, মূলধনী মুনাফার ওপর কর প্রত্যাহার এবং নতুন কোম্পানির জন্য বিশেষ কর সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছিল। যদিও এসব প্রস্তাব বাজেটে স্থান পায়নি, তবুও সংশ্লিষ্টদের বড় একটি অংশ মনে করছে, সরকারের ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে এর সুফল কর সুবিধার চেয়েও বেশি হতে পারে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন এবং মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সংগঠন—সবাই মোটামুটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের মতে, বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট দূর করতে সাহায্য করবে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বর্তমানে দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ নয়। শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে এবং ব্যাংক ঋণের প্রবাহও নিম্নমুখী। এমন পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারকে বিকল্প অর্থায়নের শক্তিশালী উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
তারা মনে করেন, এবারের বাজেটে তাৎক্ষণিক কর সুবিধার অভাব থাকলেও বাজার উন্নয়নের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, সেটি বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে। তবে সবকিছুর মূল চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়ন। কারণ অতীতেও অনেক ইতিবাচক পরিকল্পনা ঘোষণা করা হলেও সেগুলোর বড় অংশ কাঙ্ক্ষিতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
সার্বিকভাবে বাজার সংশ্লিষ্টদের মূল্যায়ন হলো, এবারের বাজেট শেয়ারবাজারকে সরাসরি সুবিধা না দিলেও একটি নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সেই দিকনির্দেশনা বাস্তবে রূপ পেলে দেশের পুঁজিবাজার আবারও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

