শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে বস্ত্র খাতের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান সোনারগাঁও টেক্সটাইলস। মাত্র এক মাসের কিছু বেশি সময়ের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় এর লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।
সোমবার লেনদেন শুরুর পর কোম্পানিটির শেয়ারের দর সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ৮ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছায়। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি নজরে আসার পর ডিএসই দিনের বাকি সময়ের জন্য শেয়ারটির লেনদেন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।
বাজার তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ মে সোনারগাঁও টেক্সটাইলসের প্রতিটি শেয়ারের বাজারদর ছিল ৩৪ টাকা। এরপর টানা ২৩ কার্যদিবসের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সায়। অর্থাৎ এক মাসের কিছু বেশি সময়ে প্রতিটি শেয়ারের মূল্য বেড়েছে প্রায় ৫৩ টাকা ৫০ পয়সা বা প্রায় ১৫৭ শতাংশ। ফলে কোম্পানিটির বাজারদর দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, এমন মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো মৌলিক বা ব্যবসায়িক কারণ আছে কি না। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করেনি। ব্যবসায়িক অবস্থারও দৃশ্যমান উন্নতির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর বাজারে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব গ্রহণের পরই ঘোষণা দেন, শেয়ারদর কারসাজির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এরই ধারাবাহিকতায় বিএসইসি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে নির্দেশ দেয়, কোনো দুর্বল বা মৌলভিত্তিহীন কোম্পানির শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে দ্রুত তদন্ত করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। সোনারগাঁও টেক্সটাইলসের ক্ষেত্রে নেওয়া পদক্ষেপকে সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, যেসব কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল, ধারাবাহিক মুনাফা নেই কিংবা ব্যবসায়িক অগ্রগতির স্পষ্ট চিত্র নেই, সেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণত বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরির ইঙ্গিত বহন করে। ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ন্ত্রকদের দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়ে।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সোনারগাঁও টেক্সটাইলস বর্তমানে লোকসানি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে কোম্পানিটির লোকসান ৫০ লাখ টাকার বেশি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি ২ কোটির বেশি টাকা লোকসান করে। লোকসানের কারণে সর্বশেষ অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশও দিতে পারেনি কোম্পানিটি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের এমন উল্লম্ফন স্বাভাবিক বিনিয়োগ প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এর পেছনে কারসাজির সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
১৯৯৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সোনারগাঁও টেক্সটাইলস তুলনামূলকভাবে ছোট মূলধনের একটি কোম্পানি। এর পরিশোধিত মূলধন মাত্র ২৬ কোটি টাকা। মোট শেয়ারের বড় অংশ উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে থাকায় বাজারে মুক্তভাবে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা সীমিত। এই ধরনের কোম্পানিতে তুলনামূলক কম শেয়ার কেনাবেচার মাধ্যমেই দামের বড় পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বাজারে ভাসমান শেয়ার কম থাকলে কিছু গোষ্ঠী সহজেই কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে মূল্যবৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। এতে প্রকৃত তথ্য না জেনেই অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী উচ্চ দামে শেয়ার কিনে ঝুঁকিতে পড়ে যান।
পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর অংশ হিসেবে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটলে দ্রুত তদন্ত এবং প্রয়োজনে লেনদেন স্থগিতের মতো ব্যবস্থা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ পুনর্লিখিত, সংবাদপত্রে প্রকাশযোগ্য, বিশ্লেষণধর্মী এবং মূল প্রতিবেদনের ভাষা ও কাঠামো থেকে স্বতন্ত্র।

