পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে স্থির রাখা দর মুক্ত হওয়ার পর বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে বেক্সিমকোর শেয়ার। মাত্র ১১ কার্যদিবসে কোম্পানিটির বাজারমূলধন থেকে ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি হারিয়ে গেছে। ক্রেতাশূন্য অবস্থায় টানা দরপতনের কারণে হাজারো বিনিয়োগকারী এখন বড় ধরনের লোকসানের মুখোমুখি।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পর বেক্সিমকোর শেয়ারের প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে সেই সমন্বয় এতটাই দ্রুত ও তীব্রভাবে ঘটছে যে প্রতিদিনই শেয়ারটির দর সর্বনিম্ন সীমায় নেমে যাচ্ছে, অথচ ক্রেতার দেখা মিলছে না।
গত ৯ জুন থেকে বেক্সিমকোর ওপর আরোপিত ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার কার্যকর হয়। এরপর থেকে টানা ১১ কার্যদিবস ধরে শেয়ারটির দরপতন অব্যাহত রয়েছে। এ সময়ে প্রতিটি শেয়ারের দাম ১১০ টাকা ১০ পয়সা থেকে নেমে ৩৪ টাকা ৯০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের মূল্য কমেছে ৭৫ টাকা ২০ পয়সা।
কোম্পানিটির মোট শেয়ারের সংখ্যা ৯৪ কোটি ৩২ লাখের বেশি হওয়ায় এই দরপতনের প্রভাব বাজারমূলধনে ব্যাপকভাবে পড়েছে। হিসাব অনুযায়ী, ১১ কার্যদিবসে বেক্সিমকোর বাজারমূলধন কমেছে প্রায় ৭ হাজার ৯৩ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পুঁজিবাজারে এটি অন্যতম বড় মূল্যহ্রাসের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিদিন বাজার খোলার পরই বিপুল পরিমাণ বিক্রয় আদেশ জমা হচ্ছে। কিন্তু বিপরীতে ক্রয় আদেশ প্রায় অনুপস্থিত থাকায় শেয়ারটির দর দ্রুত সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাচ্ছে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী লোকসান মেনে শেয়ার বিক্রি করতে চাইলেও ক্রেতা না পাওয়ায় তারা কার্যত আটকে পড়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ফ্লোর প্রাইসের কারণে বেক্সিমকোর শেয়ারের প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহের চিত্র বাজারে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে মূল্য সমন্বয়ের চাপ জমে ছিল। ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পর সেই চাপ একসঙ্গে বাজারে প্রকাশ পাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে প্রথম ফ্লোর প্রাইস চালু করা হয় ২০২০ সালে, করোনা মহামারির সময়। তখন ধারাবাহিক দরপতন ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই ব্যবস্থা নেয়। পরে তা তুলে নেওয়া হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ২০২২ সালে আবার ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়।
পরবর্তীতে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ধাপে ধাপে অধিকাংশ শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়। তবে বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন এই সীমা বহাল ছিল। অবশেষে চলতি মাসে দুই কোম্পানির ক্ষেত্রেই সেই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়।
মজার বিষয় হলো, একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রথমদিকে কিছুটা কমলেও পরে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বেক্সিমকোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে বিক্রির চাপ কমার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
বাজার পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বেক্সিমকোর শেয়ার একসময় অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিরও সাক্ষী ছিল। ২০২০ সালের মার্চে যেখানে শেয়ারটির দাম ছিল মাত্র ১০ টাকা ৭৬ পয়সা, সেখানে পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে প্রায় ১৭৯ টাকায় পৌঁছেছিল। এরপর দরপতন শুরু হলে ফ্লোর প্রাইসের মাধ্যমে শেয়ারটির মূল্য দীর্ঘ সময় নির্দিষ্ট পর্যায়ে ধরে রাখা হয়।
বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারধারীদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সাধারণ বিনিয়োগকারী রয়েছেন। এছাড়া উদ্যোক্তা-পরিচালক, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার রয়েছে। ফলে চলমান দরপতনের প্রভাব বাজারের বিভিন্ন স্তরের বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়ছে।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো শেয়ারের মূল্য দীর্ঘ সময় প্রশাসনিকভাবে আটকে রাখা হলে প্রকৃত বাজার পরিস্থিতি প্রতিফলিত হয় না। পরে সেই নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার পর হঠাৎ বড় ধরনের মূল্য সমন্বয় ঘটে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বেক্সিমকোর বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।
এখন বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে শেয়ারটির বিক্রয়চাপ কবে কমে এবং বাজারে নতুন ক্রেতা ফিরে আসে কি না। কারণ ক্রেতার অংশগ্রহণ না বাড়লে বেক্সিমকোর শেয়ারের ওপর চাপ আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বাজারসংশ্লিষ্টরা।

