দেশের পুঁজিবাজারে টানা অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। সপ্তাহের মাঝামাঝি লেনদেন দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম—দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই সূচক ও অধিকাংশ খাতের শেয়ারের দর বেড়েছে। বাজারজুড়ে ক্রেতাদের সক্রিয় উপস্থিতির কারণে প্রায় সব খাতেই ইতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বুধবারের লেনদেনে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) শুরু থেকেই ক্রয়চাপ ছিল লক্ষণীয়। ফলে দিনের পুরো সময় সূচক ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে থেকে শেষ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নিয়ে লেনদেন শেষ করে। প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৫১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৬০৫ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা আগের কার্যদিবসে ছিল ৫ হাজার ৫৫৪ পয়েন্ট। শতাংশের হিসাবে সূচক প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে।
ব্লু-চিপ বা বড় মূলধনি কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী ডিএস-৩০ সূচকও ইতিবাচক অবস্থানে ছিল। সূচকটি ১৭ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১২৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসইএস ১০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ১৪০ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধান সূচকের উত্থানে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে ওষুধ, ব্যাংকিং এবং আর্থিক খাতের কয়েকটি বড় কোম্পানির শেয়ার। বিশেষ করে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, বেস্ট হোল্ডিংস, আইপিডিসি, সিটি ব্যাংক এবং শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর বৃদ্ধির প্রভাব সূচকে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
যদিও সূচক বেড়েছে, তবে মোট লেনদেনের পরিমাণ সামান্য কমেছে। ডিএসইতে এদিন ৮২৮ কোটি টাকার শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য সিকিউরিটিজ হাতবদল হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৮৭৬ কোটি টাকার। তবে লেনদেন কমলেও বাজারে দরবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা বাজারের সামগ্রিক ইতিবাচক প্রবণতাকে নির্দেশ করে।
ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ৩৯৫টি কোম্পানি ও সিকিউরিটিজের মধ্যে ২৭৯টির শেয়ারদর বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে মাত্র ৫৫টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৬১টির। অর্থাৎ বাজারে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ইতিবাচক অবস্থানে ছিল।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, লেনদেনের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করেছে ওষুধ ও রসায়ন খাত। মোট লেনদেনের ১৬ দশমিক ১ শতাংশ এ খাতের দখলে ছিল। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্যাংক খাতের অংশ ছিল ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রকৌশল খাত ১১ দশমিক ২ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় স্থানে এবং সাধারণ বীমা খাত ১১ দশমিক ১ শতাংশ নিয়ে চতুর্থ স্থানে ছিল। এছাড়া বস্ত্র খাত মোট লেনদেনের ৯ দশমিক ২ শতাংশ অংশ নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।
রিটার্নের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স করেছে ভ্রমণ ও অবকাশ খাত। এ খাতে গড় রিটার্ন এসেছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। সাধারণ বীমা খাতে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে। বাজারের প্রায় সব খাতেই দরবৃদ্ধির প্রবণতা থাকলেও ব্যতিক্রম ছিল বিবিধ খাত। এ খাতে গড় রিটার্ন ২ শতাংশের বেশি কমেছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও ইতিবাচক ধারা বজায় ছিল। এক্সচেঞ্জটির নির্বাচিত সূচক সিএসসিএক্স ৫ পয়েন্ট বেড়ে ৯ হাজার ২৩৮ পয়েন্টে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৩৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ হাজার ১১৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
সিএসইতে লেনদেন হওয়া ২১১টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৯৮টির দর বেড়েছে, ৮০টির কমেছে এবং ৩৩টির দর অপরিবর্তিত ছিল। লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিন এক্সচেঞ্জটিতে ৯৮ কোটি টাকার সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছে, যেখানে আগের কার্যদিবসে লেনদেন ছিল ৭৪ কোটি টাকা।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সূচকের ধারাবাহিক উন্নতি এবং অধিকাংশ খাতের শেয়ারদরে ঊর্ধ্বগতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করছে। বিশেষ করে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ওষুধ ও বীমা খাতে ক্রয় আগ্রহ বাড়ায় বাজারে নতুন গতি ফিরেছে। তবে এই ইতিবাচক ধারা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে লেনদেনের পরিমাণ আরও বাড়ানো, ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সামগ্রিকভাবে দিনের লেনদেন শেষে বলা যায়, অধিকাংশ খাতের ইতিবাচক পারফরম্যান্স, সূচকের শক্তিশালী উত্থান এবং দুই স্টক এক্সচেঞ্জে ক্রয়চাপ বৃদ্ধির ফলে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন করে আশাবাদের আবহ তৈরি হয়েছে।

