দীর্ঘদিন পর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে শক্তিশালী মুনাফার ঘোষণা দিয়েছে দেশের শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৬৯৪ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। একই সঙ্গে শেয়ারধারীদের জন্য ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যার মোট মূল্য প্রায় ২১২ কোটি টাকা।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় কোম্পানিটির সর্বশেষ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব অনুমোদন করা হয়। ওই সভায় বিভিন্ন প্রান্তিকের অনিষ্পন্ন আর্থিক প্রতিবেদনও চূড়ান্ত করা হয়েছে। আর্থিক ফলাফল অনুযায়ী, কোম্পানির শেয়ারধারীরা প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ৪ টাকা ৭৫ পয়সা নগদ লভ্যাংশ পাবেন।
ঘোষিত লভ্যাংশ বিতরণের জন্য আগামী ২ আগস্ট রেকর্ড তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই দিন যেসব বিনিয়োগকারীর কাছে কোম্পানির শেয়ার থাকবে, তারাই লভ্যাংশ পাওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন। আদালতের অনুমোদনের পর বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং সভার অনুমোদন সাপেক্ষে লভ্যাংশ বিতরণ করা হবে।
লভ্যাংশ বণ্টনের হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালক শ্রেণির শেয়ারধারীরা প্রায় ৬৪ কোটি টাকার লভ্যাংশ পাবেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ হবে প্রায় ৫৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশে যাবে প্রায় ৫৪ কোটি টাকা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পাবেন প্রায় ৩৬ কোটি টাকার লভ্যাংশ।
বেক্সিমকো ফার্মার মালিকানার সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ও করপোরেট অঙ্গনের পরিচিত একটি পরিবারের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কোম্পানিটির পরিচালনা কাঠামো নিয়ে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়। তবে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ করা হলে বিষয়টি বিচারাধীন অবস্থায় চলে যায়।
আইনি জটিলতার কারণে প্রায় দেড় বছর কোম্পানিটির কোনো পরিচালনা পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি এবং বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার তথ্য থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
এই বিলম্বের প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ঢাকার শেয়ারবাজারের পাশাপাশি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটেও তালিকাভুক্ত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেখানে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন স্থগিত হয়ে যায়।
বিধি অনুযায়ী দীর্ঘ সময় লেনদেন বন্ধ থাকলে তালিকাচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং দ্রুত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সম্মতির ভিত্তিতে পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং কোম্পানিটি তাদের অনিষ্পন্ন আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে সক্ষম হয়।
তবে শক্তিশালী মুনাফা ও আকর্ষণীয় লভ্যাংশ ঘোষণার পরও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। বুধবার লেনদেন চলাকালে কোম্পানির শেয়ারের দাম কিছুটা কমে যায়। যদিও দরপতন হয়েছে, তবু লেনদেনের পরিমাণে কোম্পানিটি ছিল বাজারের শীর্ষে। একদিনেই কয়েক দশক কোটি টাকার সমপরিমাণ শেয়ার হাতবদল হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং উল্লেখযোগ্য মুনাফা বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে কোম্পানির পরিচালনা কাঠামো, আদালতে চলমান মামলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলো আগামী দিনে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
তাদের মতে, বেক্সিমকো ফার্মার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো করপোরেট সুশাসনের বিষয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনা, আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখা এবং ধারাবাহিকভাবে মুনাফা বৃদ্ধির সক্ষমতা প্রমাণ করা। সেই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা নজর রাখবেন কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা কাঠামো এবং ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ পরিকল্পনার ওপর।

