দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে এক জটিল ও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তারল্যের ঘাটতি, বাজার কারসাজি, সুশাসনের অভাব, দুর্বল তদারকি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা—সব মিলিয়ে বাজারটি এখনও স্থিতিশীল অবস্থানে ফিরতে পারেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ এবং বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা শুরু হলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে এখনো বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—বাংলাদেশের পুঁজিবাজার কি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?
সাম্প্রতিক সময়ে টানা দুই কার্যদিবস পতনের পর সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের উত্থান দেখা গেছে। মূলত স্বল্পমেয়াদি মুনাফার আশায় বিনিয়োগকারীরা মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় শেয়ারগুলোর প্রতি আগ্রহ দেখানোয় বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা ফিরে আসে। তবে এই উত্থান বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে যথেষ্ট নয়।
কারসাজির শেয়ারের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক বিনিয়োগকারী এখনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন, এমনকি ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারও বিক্রি করে দিচ্ছেন। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সূচক বাড়লেও টাকার অঙ্কে লেনদেন কমেছে, যা বাজারে বিদ্যমান সতর্ক মনোভাবেরই প্রতিফলন।
পুঁজিবাজারের প্রাণশক্তি হলো তারল্য বা অর্থের প্রবাহ। বর্তমানে সেই প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ, ডলার সংকট, মূলধন ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের সুশাসন সংকটের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে বাজারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে পারছে না। নীতিবহির্ভূত ঋণ বিতরণ ও আর্থিক অনিয়মের প্রভাবও ব্যাংক খাতকে দুর্বল করেছে। খেলাপি ঋণের চাপ সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিপুল পরিমাণ তারল্য সহায়তা দিতে হয়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির ফলে সুদহার বেড়েছে। এর প্রভাবে ব্যাংকের স্থায়ী আমানত (এফডিআর) এবং ট্রেজারি বিলের মতো তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ফলে বড় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ পুঁজিবাজার থেকে সরে গিয়ে বিকল্প খাতে অর্থ বিনিয়োগ করছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়া এবং উচ্চ সুদের কারণে অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানও শেয়ারবাজারের পরিবর্তে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নকে বেশি নিরাপদ মনে করছে। এর ফলে বাজারে নতুন অর্থের প্রবাহ কমেছে এবং দৈনিক লেনদেনও আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
তারল্য সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা। মিউচুয়াল ফান্ড, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং অন্যান্য বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বাজারের অনিশ্চয়তা ও নিজস্ব তহবিল সীমাবদ্ধতার কারণে আগের মতো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তবে পুঁজিবাজারের সংকট কেবল তারল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিনের বাজার কারসাজি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাজার ব্যবস্থার মধ্যেও বিভিন্ন সময়ে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি, দুর্বল কোম্পানির শেয়ারকে অস্বাভাবিকভাবে মূল্যায়ন এবং সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে মৌলভিত্তিসম্পন্ন বা ব্লু-চিপ শেয়ারগুলো উপেক্ষিত থাকলেও দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর ফলে ইনসাইডার ট্রেডিং, সিন্ডিকেটভিত্তিক লেনদেন এবং গুজবনির্ভর বিনিয়োগের প্রবণতা বেড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে ডিএসই কয়েকটি দুর্বল ও বন্ধ কোম্পানির শেয়ারের রিয়েল-টাইম লেনদেন স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে বহু তালিকাভুক্ত কোম্পানি নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করেও দীর্ঘদিন ধরে নিয়ম লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। আর্থিক বিবরণীতে স্বচ্ছতার অভাব, তথ্য গোপন এবং দুর্বল করপোরেট সুশাসন বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে দুর্বলতার অভিযোগ রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন কারসাজির ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অপরাধের তুলনায় জরিমানার পরিমাণ কম হওয়ায় কারসাজিকারীদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়নি। ফলে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি দুর্বল হয়েছে এবং বাজারে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে।
পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আইপিও প্রক্রিয়ার কিছু পুরোনো দুর্বলতাও দায়ী। প্লেসমেন্ট শেয়ার বাণিজ্য, আর্থিক হিসাব ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন এবং দুর্বল কোম্পানিকে বাজারে আনার মতো অনিয়মের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রত্যাশিত ফলাফল দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব এখনও বাজারে রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সংকট সূচকের ওঠানামা নয়; বরং আস্থার সংকট। একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা। যখন বিনিয়োগকারীরা মনে করেন যে বাজারে কারসাজি হচ্ছে, তথ্য গোপন করা হচ্ছে কিংবা নিয়ম লঙ্ঘনের বিচার হচ্ছে না, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগ থেকে সরে যেতে শুরু করেন। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা, যারা প্রায়ই গুজব ও কৃত্রিম দরবৃদ্ধির ফাঁদে পড়ে ক্ষতির সম্মুখীন হন।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশার নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ডিএসই বাজারে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। অতীতের বড় ধরনের জালিয়াতি ও কারসাজির ঘটনা তদন্তে বিশেষ টাস্কফোর্স ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ অনিয়মকারীদের জন্য সতর্কবার্তা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে বহুজাতিক ও লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগের কথাও আলোচনায় রয়েছে। বাজারে মানসম্পন্ন ও শক্তিশালী কোম্পানির সংখ্যা বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং বাজারের গভীরতাও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে রিয়েল-টাইম কারসাজি শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারকে টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার করতে হলে সাময়িক প্রণোদনার বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারে গুরুত্ব দিতে হবে। বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং এবং আর্থিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। করপোরেট সুশাসন শক্তিশালী করা, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং তালিকাভুক্তির নিয়ম আধুনিকায়নের মাধ্যমে বহুজাতিক ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কর কাঠামো যৌক্তিক করা, বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ, দ্রুত লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু এবং পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত আদালত গঠনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মৌলভিত্তিক বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।
পুঁজিবাজারের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, তাই এর সমাধানও রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর নজরদারি, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে বাজারে আস্থা ফিরতে শুরু করবে। আর আস্থা ফিরলে তারল্যের প্রবাহ বাড়বে, বিনিয়োগ সক্রিয় হবে এবং পুঁজিবাজার ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক শক্তি ফিরে পাবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে আরও শক্তিশালী করতে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়।

