সপ্তাহজুড়ে ওঠানামার মধ্য দিয়ে দেশের শেয়ারবাজারে শেষ হয়েছে লেনদেন। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তিন দিন সূচকে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেলেও বাকি দুই দিনের বড় ধরনের দরপতনের প্রভাবে পুরো সপ্তাহের চিত্র নেতিবাচক হয়ে ওঠে।
ফলে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদাম কমে যাওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন প্রায় এক হাজার কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে কমেছে প্রধান মূল্যসূচক এবং দৈনিক গড় লেনদেনও।
সাপ্তাহিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সপ্তাহ শেষে ডিএসইর মোট বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে এই অঙ্ক ছিল ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার থেকে ৯১৪ কোটি টাকার মূলধন কমে গেছে।
সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১৪৫টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ২২২টির দাম কমেছে, আর ২১টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। দাম কমা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হওয়ায় সামগ্রিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাজার মূলধনের পাশাপাশি প্রধান মূল্যসূচকেও পতন লক্ষ্য করা গেছে। ডিএসইএক্স সূচক সপ্তাহের ব্যবধানে ৮ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে। এর আগের সপ্তাহে একই সূচক ১৪০ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট বেড়ে বাজারে শক্তিশালী ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি করেছিল। ফলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই গতি অনেকটাই থেমে গেছে।
শুধু প্রধান সূচকই নয়, অন্যান্য সূচকেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৬ দশমিক ৮২ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচকও ১১ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ হারিয়েছে।
লেনদেনের পরিমাণেও বড় ধরনের ধীরগতি দেখা গেছে। গত সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৯৫১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহে যেখানে প্রতিদিন গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ২৮৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে দৈনিক গড় লেনদেন কমেছে ৩৩২ কোটি ২৮ লাখ টাকা, যা প্রায় ২৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ হ্রাসের সমান। বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান এবং বাজারে আস্থার ঘাটতির কারণে লেনদেনের গতি কমে যেতে পারে।
লেনদেনের দিক থেকে সপ্তাহের শীর্ষে ছিল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। কোম্পানিটির শেয়ারে প্রতিদিন গড়ে ৫৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে, যা মোট লেনদেনের প্রায় ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিমিট এলায়েন্স পোর্ট, যার গড় দৈনিক লেনদেন ৩২ কোটি ৪ লাখ টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা আইপিডিসি ফাইন্যান্সের শেয়ারে প্রতিদিন গড়ে ২৮ কোটি ১১ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।
লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির তালিকায় আরও রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, ন্যাশনাল ফিড মিলস, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, রবি, এনসিসি ব্যাংক এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগকারীর আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক সপ্তাহের ঊর্ধ্বগতির পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব সূচক ও বাজার মূলধনে পড়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখনও বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা মনে করেন, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি, কার্যকর নীতিগত সহায়তা এবং লেনদেনের গতি বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তাদের মতে, বাজারের সাময়িক ওঠানামা পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং বাজারে ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

