দীর্ঘদিনের টানা বিক্রির চাপ এবং ক্রেতাশূন্য অবস্থার পর অবশেষে পুঁজিবাজারে বেক্সিমকোর শেয়ারে ফিরেছে ক্রেতাদের আগ্রহ। রোববার লেনদেন শুরুর পর প্রথম আধাঘণ্টার মধ্যেই কোম্পানিটির প্রায় ১০০ কোটি টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। এতে টানা দরপতনের পর শেয়ারটিকে ঘিরে বাজারে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর টানা ১৩ কার্যদিবস বেক্সিমকোর শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির চাপ থাকলেও এদিন চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। দিনের শুরুতে সর্বনিম্ন দামে বিপুল পরিমাণ বিক্রির আদেশ এলেও অল্প সময়ের মধ্যে ক্রেতারা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ফলে শেয়ারটির দাম দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে দিনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
সকাল সাড়ে ১০টার কিছু পর পর্যন্ত কোম্পানিটির প্রায় ৯৮ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। একই সময়ে কয়েক কোটি টাকার সমপরিমাণ শেয়ার সর্বোচ্চ দামে কেনার অপেক্ষায় বিনিয়োগকারীদের ক্রয় আদেশ জমা ছিল। এতে বোঝা যায়, দীর্ঘদিনের বিক্রির চাপ কাটিয়ে শেয়ারটিতে আবারও চাহিদা তৈরি হয়েছে।
শুধু বেক্সিমকো নয়, সার্বিক বাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে এদিন প্রথম ভাগেই কয়েকশ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। একই সঙ্গে প্রধান মূল্যসূচকসহ অন্যান্য সূচকও ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে ছিল, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার আংশিক ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বেক্সিমকোর সাম্প্রতিক মূল্যপতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল দীর্ঘদিন ধরে বহাল থাকা ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন চলতি মাসের শুরুতে বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের ওপর আরোপিত ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। এরপর থেকেই বাজারের প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে শেয়ারটির দাম নির্ধারিত হতে শুরু করে।
ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কয়েক কার্যদিবসের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়ালেও বেক্সিমকোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। টানা ১৩ কার্যদিবস শেয়ারটিতে ক্রেতার সংকট দেখা দেয় এবং দাম ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। একসময় ১১০ টাকা ১০ পয়সায় স্থির থাকা শেয়ারের মূল্য নেমে আসে ২৫ টাকা ৬০ পয়সায়। তবে রোববারের লেনদেনে তা আবার ৩১ টাকার বেশি পর্যায়ে উঠে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে একটানা দরপতনের কারণে অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ারটির বর্তমান মূল্যকে আকর্ষণীয় মনে করে নতুন করে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি মুনাফার আশায় কিছু বিনিয়োগকারীর সক্রিয় অংশগ্রহণও লেনদেন বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। তবে একটি দিনের উত্থানকে স্থায়ী পুনরুদ্ধারের সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ এখনই নেই বলে তারা সতর্ক করেছেন।
বাজার বিশ্লেষকদের ভাষ্য, কোনো শেয়ারের দামের টেকসই পুনরুদ্ধার নির্ভর করে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ আয় এবং বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থার ওপর। তাই শুধু লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি বা একদিনের মূল্যবৃদ্ধিকে ইতিবাচক মোড় হিসেবে বিবেচনা করার আগে আরও কয়েকটি কার্যদিবসের বাজার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ফ্লোর প্রাইস প্রথম চালু হয় ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়। পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করা হলেও ২০২২ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আবারও এই ব্যবস্থা চালু করা হয়। দীর্ঘদিন ফ্লোর প্রাইস বহাল থাকায় বাজারের স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। সমালোচনার মুখে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পর্যায়ক্রমে বেশিরভাগ কোম্পানির ক্ষেত্রে এ সীমাবদ্ধতা তুলে নিলেও বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে তা দীর্ঘদিন বহাল ছিল।
বর্তমানে বেক্সিমকোর মোট শেয়ারের একটি বড় অংশ সাধারণ বিনিয়োগকারী, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে রয়েছে। ফলে শেয়ারটির দামের ওঠানামা বাজারের সামগ্রিক লেনদেন ও বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।
রোববারের লেনদেন বাজারে নতুন আশার বার্তা দিলেও বেক্সিমকোর শেয়ার আগামী দিনে স্থিতিশীল অবস্থানে ফিরতে পারে কি না, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, কোম্পানির মৌলভিত্তি এবং সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতির ওপর।

