যেকোনো দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ও বিনিয়োগ পরিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হলো পুঁজিবাজার। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, মূলধন সংগ্রহ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও সুশাসনভিত্তিক পুঁজিবাজারের ভূমিকা অপরিসীম।
কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে আস্থাহীনতা, কারসাজি, দুর্বল সুশাসন, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক খাতের নানা অনিয়মের কারণে প্রত্যাশিত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। বিশেষ করে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রভাব সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে একদিকে সূচকের বড় ধরনের পতন ঘটে, অন্যদিকে লেনদেনে স্থবিরতা নেমে আসে এবং দীর্ঘ সময় বাজার মন্দার মধ্যে আটকে থাকে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নতির ফলে বাজারে আস্থা পুনরুদ্ধারের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিছুটা কমে আসায় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক গতি ফিরে এসেছে, যার প্রভাব ধীরে ধীরে পুঁজিবাজারেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
বড় ধরনের দরপতনের পরও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স কয়েক দফায় ৫ হাজার ৫৫০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। বর্তমানে সূচক ৫ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৭০০ পয়েন্টের মধ্যে অবস্থান করে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাজারে ভারসাম্য ফিরে আসার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
বাজারে সাময়িক বিক্রয়চাপ বা মূল্য সংশোধনের সময় সূচকে কিছুটা পতন দেখা দিলেও মৌলভিত্তি শক্তিশালী এবং বড় মূলধনী কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ অব্যাহত থাকায় বাজার দ্রুত পুনরুদ্ধার করছে। বাজেট-পরবর্তী ইতিবাচক বিনিয়োগ পরিবেশ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমে আসায় বাজারে নতুন করে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে।
ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন তুলনামূলক নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাময় কোম্পানির প্রতি বেশি আস্থা রাখছেন এবং মৌলভিত্তিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে। এতে বাজারের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি নতুন ও মানসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে এবং দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কারণে অনেক ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম এখনও তুলনামূলক কম রয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি সম্ভাবনাময় একটি সময়। কারণ, কম দামে মানসম্পন্ন শেয়ার কেনার সুযোগ ভবিষ্যতে ভালো রিটার্নের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
সর্বশেষ সাপ্তাহিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইএক্স সপ্তাহজুড়ে কিছুটা ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেলেও বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সপ্তাহের শুরুতে সূচক ৫ হাজার ৬৬১ দশমিক ৩৮ পয়েন্টে থাকলেও শেষ কার্যদিবসে তা ৮ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৬৫২ দশমিক ৮২ পয়েন্টে দাঁড়ায়। ফলে সপ্তাহটি সামান্য নেতিবাচক ধারায় শেষ হলেও বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়নি।
এর আগের সপ্তাহে অবশ্য বাজারে শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ২৫ জুন সমাপ্ত সপ্তাহে ডিএসইএক্স সূচক ১৪১ পয়েন্ট বেড়ে প্রায় সাড়ে নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায় এবং ৫ হাজার ৬৬১ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময়ে ডিএসই-৩০ সূচকও প্রায় ৭০ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৪৩ পয়েন্টে উন্নীত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই ওঠানামা বাজারের স্বাভাবিক সংশোধন প্রক্রিয়ারই অংশ।
লেনদেনেও সাম্প্রতিক সময়ে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দৈনিক লেনদেন অনেক সময় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মধ্যে অবস্থান করছে, যা বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রতিফলন। যদিও বিদায়ী সপ্তাহে মোট শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন আগের সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা কমেছে এবং বাজার মূলধন ৯১৪ কোটি টাকা কমে ৬ লাখ ৯২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, তবুও সামগ্রিক বাজারে আস্থার ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।
খাতভিত্তিক লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকৌশল, ওষুধ ও রসায়ন, সাধারণ বিমা এবং কিছু বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে দুর্বল আর্থিক অবস্থার কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে সীমিত চাপ থাকলেও সামগ্রিকভাবে মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে, যা বাজারকে আরও বাস্তবভিত্তিক ও স্থিতিশীল করে তুলছে।
বাজারের ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাজারে অনিয়ম ও কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, জবাবদিহিতা নিশ্চিতের প্রচেষ্টা, দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মের আওতায় আনা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে আরও শক্তিশালী করতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্ড মার্কেটের সম্প্রসারণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে বাজারের গভীরতা ও সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, পুঁজিবাজারের সূচকের প্রতিদিনের ওঠানামা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়; বরং এটি একটি কার্যকর ও গতিশীল বাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। অতীতের সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি ধারাবাহিক সংস্কার, কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকে, তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। অতীতের মন্দা কাটিয়ে একটি আরও স্থিতিশীল, আধুনিক ও টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তোলার সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি

