বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে টানা কয়েক দিনের মন্দাভাব কাটিয়ে নতুন সপ্তাহের লেনদেনে ফিরেছে ইতিবাচক ধারা। দীর্ঘ সময় বিক্রির চাপ ও ক্রেতাসংকটে থাকা বেক্সিমকোর শেয়ারে হঠাৎ ক্রেতার আগ্রহ বাড়ায় বাজারে আশাবাদী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সার্বিক সূচক ও লেনদেনেও। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম—উভয় শেয়ারবাজারেই টানা চতুর্থ কার্যদিবস সূচক ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে রয়েছে।
টানা ১৩ কার্যদিবস ক্রেতাশূন্য অবস্থায় মূল্যহ্রাসের মুখে থাকা বেক্সিমকোর শেয়ার সোমবার বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন করেছে। দিনের শুরুতে কিছুটা বিক্রির চাপ থাকলেও পরে ক্রেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে শেয়ারটির দাম সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই পরিবর্তনের প্রভাব পুরো পুঁজিবাজারে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে মূল্যসূচকের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বেক্সিমকোর শেয়ার দর দ্রুত কমে যাওয়ার পর অনেক বিনিয়োগকারী এটিকে তুলনামূলক কম দামে কেনার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। সেই আগ্রহই দিনের শেষভাগে বড় আকারের ক্রয়চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে শুধু বেক্সিমকো নয়, অন্যান্য খাতের শেয়ারেও ইতিবাচক মনোভাব ফিরে আসে।
দিনশেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ২১৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ১৩৩টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৮টির। বাজারের অধিকাংশ খাতেই ক্রয়চাপ লক্ষ্য করা গেছে।
লভ্যাংশ প্রদানকারী ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর মধ্যেও ইতিবাচক প্রবণতা ছিল। ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া ১১১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, কমেছে ৭০টির। অপরদিকে, মাঝারি লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যেও দাম বাড়ার সংখ্যা ছিল তুলনামূলক বেশি। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থানে থাকা ‘জেড’ শ্রেণির বহু কোম্পানির শেয়ারেও ক্রেতাদের আগ্রহ দেখা গেছে।
বাজারের এই ইতিবাচক প্রবণতায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৬৬ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৭১৯ পয়েন্টে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে শরিয়াহ সূচক ১৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ১৫৬ পয়েন্টে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ৩১ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৬২ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
শুধু সূচক নয়, লেনদেনেও বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। ডিএসইতে মোট ১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকার বেশি শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় প্রায় ২৬০ কোটি টাকা বেশি। বাজারে তারল্য বৃদ্ধির এই প্রবণতাকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
লেনদেনের শীর্ষে ছিল বেক্সিমকো। কোম্পানিটির প্রায় ১০৬ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এরপর লেনদেনের তালিকায় ছিল এনসিসি ব্যাংক, আইটি কনসালট্যান্ট, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মা, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।
অন্যদিকে, কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর কমেছে। এদিন সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে ড্যাফোডিল কম্পিউটারসের। এছাড়া সিএপিএম আইবিবিএল ইসলামি মিউচ্যুয়াল ফান্ড, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স, ন্যাশনাল ফিড মিল, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, এসকে ট্রিমস, তুং হাই নিটিং, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস এবং রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলসের শেয়ারেও মূল্যহ্রাস হয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। বাজারটির সার্বিক সূচক ২০৫ পয়েন্ট বেড়েছে। সেখানে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২১৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৮টির শেয়ার দর বেড়েছে, কমেছে ৬১টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩২টির।
তবে চট্টগ্রাম বাজারে সূচক বাড়লেও লেনদেনের পরিমাণ কমেছে। এদিন মোট ৩৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বেক্সিমকোর মতো বড় মূলধনী কোম্পানির শেয়ারে ইতিবাচক পরিবর্তন সামগ্রিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে একদিনের উত্থানকে স্থায়ী প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ এখনই নেই। বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার জরুরি।
তাদের মতে, যদি বর্তমান ক্রয়চাপ কয়েকটি কার্যদিবস ধরে অব্যাহত থাকে এবং বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ারে ইতিবাচক প্রবণতা বজায় থাকে, তাহলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল ঊর্ধ্বমুখী ধারা তৈরি হতে পারে।

