শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণাকে ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একদিকে দুর্বল কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, অন্যদিকে নগদ ও স্টক—উভয় ধরনের লভ্যাংশের ওপর নতুন কর ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর শর্তের কারণে চলতি বছর বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত লভ্যাংশ পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৫০টি কোম্পানির মধ্যে ১২৭টি ‘জেড’ ক্যাটাগরিভুক্ত বা দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে ৬২টি কোম্পানিকে ‘রেড অ্যালার্ট’ তালিকায় রাখা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই চলতি বছর লভ্যাংশ ঘোষণা করার সম্ভাবনা খুবই কম। একই সঙ্গে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) তারল্য সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬ হিসাব বছর থেকে দুই হাজার কোটি টাকার কম পরিশোধিত মূলধনের কোনো ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না। ফলে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে কেবল ব্র্যাক ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা রাখবে। অন্য ব্যাংকগুলো স্টক লভ্যাংশ দিতে চাইলে ঘোষিত স্টক লভ্যাংশের সমপরিমাণ অর্থের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত কর দিতে হবে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও প্রথমবারের মতো স্টক লভ্যাংশের ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নগদ লভ্যাংশ কম দিলে অতিরিক্ত করের বিদ্যমান বিধানও বহাল থাকছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এতে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার আগ্রহ আরও কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার বলেন, একটি কোম্পানি মুনাফা ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহার করবে নাকি লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করবে, সেটি তার ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরিবর্তে কোম্পানিগুলোকে তারল্য ব্যবস্থাপনায় সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত বিধিনিষেধ ও করের কারণে ভালো কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান লভ্যাংশ দিতে না পারায় বিনিয়োগকারীদের জন্য চলতি বছরটি কঠিন হতে পারে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিনের মতে, স্টক লভ্যাংশকে নিরুৎসাহিত করতে কর আরোপ ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। তার ভাষ্য, প্রকৃতপক্ষে ভালো কোম্পানিগুলো সাধারণত স্টক লভ্যাংশ দেয় না; বরং দুর্বল কোম্পানিগুলো শেয়ার সংখ্যা বাড়াতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে।
অন্যদিকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়াহেদুজ্জামান করিম মনে করেন, লভ্যাংশের ওপর বিদ্যমান দ্বৈত করের পাশাপাশি স্টক লভ্যাংশে নতুন কর আরোপ শেয়ারবাজারের জন্য আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র আবুল কালাম জানিয়েছেন, ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে কমিশন। পাশাপাশি শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

