পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে একগুচ্ছ কর-সুবিধা ও নীতিগত সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর জাতীয় সংসদে সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আগামী অর্থবছরে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অব্যাহত রাখা এবং পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় একটি চাপের মুখে থাকা অর্থনীতি পেয়েছিল। তবে ধারাবাহিক সংস্কার, সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং জনগণের সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলাকে সরকার কেবল অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখছে। এ কারণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বিত প্রয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়ানো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যে উৎসে কর কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে কারসাজি দমন, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগও চলমান থাকবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এবং কর প্রশাসন আধুনিক করার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। কর ব্যবস্থার অটোমেশন, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থাকে পৃথক করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ভ্যাট পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হলেও কাঁচাবাজার ও ছোট মুদি দোকানকে এই ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায় ৪ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। আগামী অর্থবছরেও নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে সরকার আশাবাদী।
পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে বেশ কয়েকটি কর-সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জিরো-কুপন বন্ড থেকে অর্জিত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত করা, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার হ্রাস, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বা রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহকারী কোম্পানির জন্য অতিরিক্ত কর-সুবিধা, লভ্যাংশের ওপর করহার কমানো এবং মিউচুয়াল ফান্ডে কর-রেয়াত পেতে বিদ্যমান পাঁচ লাখ টাকার বিনিয়োগসীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব।
সরকারের আশা, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আরও বেশি ভালো ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও শক্তিশালী হবে।
সরকারি ঋণ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা নিয়েও বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা বাড়ে এবং বিনিয়োগে গতি আসে।
অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রায় ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৯ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার আবেদন পাঠানো হয়েছে। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করা হয়েছে।
একীভূত হওয়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের গ্রাহকদের বিষয়ে তিনি পুনরায় আশ্বস্ত করে বলেন, ব্যক্তিগত আমানতকারীরা প্রথম ধাপে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। বাকি অর্থ পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হবে। ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিসে থাকা রোগী, হজ সঞ্চয়কারী এবং ডিপিএস গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সুবিধাও থাকবে।
এ সময় অর্থমন্ত্রী আরও ঘোষণা দেন, বিভিন্ন মহলের মতামত বিবেচনায় ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সংস্কার অব্যাহত রাখবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু শর্ত থাকায় সরকার আগের কর্মসূচি থেকে সরে এসেছে। ভবিষ্যতে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই নতুন কোনো কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হবে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করাই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। এজন্য বেসরকারি খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ, উদ্ভাবন এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা সহজ করতে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমানোর নীতিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান নয়; বরং কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এ জন্য ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্প পর্যবেক্ষণ, ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারে ঘোষিত কর-সুবিধাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়তে পারে। তবে শুধু কর-ছাড় নয়, সুশাসন, স্বচ্ছতা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির মানোন্নয়ন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সংস্কারই শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করবে।

