অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতার পর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।
বছরের শুরু থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের উল্লেখযোগ্য উত্থান, লেনদেনের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং একাধিক খাতে শক্তিশালী রিটার্ন বাজারে নতুন করে আশাবাদ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ মন্দার পর বাজারে তারল্য ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ায় পুঁজিবাজার আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বাজার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ছিল ৪ হাজার ৮৬৫ পয়েন্ট। জুনের শেষ কার্যদিবসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭৬৩ পয়েন্টে। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসে সূচক বেড়েছে ৮৯৭ পয়েন্ট বা প্রায় ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুধু প্রধান সূচকই নয়, বাজারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূচকেও একই ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। নির্বাচিত বড় কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস-৩০ ছয় মাসে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১৭৮ পয়েন্টে পৌঁছেছে। অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসইএস বেড়েছে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং এর অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৬৮ পয়েন্টে।
লেনদেনের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বছরের প্রথম দিনে যেখানে মোট লেনদেন ছিল মাত্র ৩৬৮ কোটি টাকা, সেখানে জুনের শেষ কার্যদিবসে তা দেড় হাজার কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। এ সময়ে বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় গড় দৈনিক লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দৈনিক গড় লেনদেন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। তুলনামূলকভাবে ২০২৫ সালে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৫২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাজারে তারল্যের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে জুন মাসে দৈনিক গড় লেনদেন ১ হাজার ২০৬ কোটি টাকায় পৌঁছানো বাজারে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহের প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যদিও পুরো সময়টি সমানভাবে ইতিবাচক ছিল না। ছয় মাসের মধ্যে মার্চ মাসে বাজারে সাময়িক চাপ তৈরি হয় এবং ওই মাসে সূচকের রিটার্ন ছিল ঋণাত্মক ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, এপ্রিল, মে এবং জুন—বাকি পাঁচ মাসেই বাজার ইতিবাচক ধারায় ছিল। ফলে সামগ্রিকভাবে প্রথমার্ধে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলো সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স করেছে। এ খাতের শেয়ারের গড় রিটার্ন ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ। সাধারণ বীমা খাতে এসেছে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ রিটার্ন। সিরামিক খাতের শেয়ার বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সিমেন্ট খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
অন্যদিকে সব খাত সমানভাবে লাভবান হয়নি। বিবিধ খাতের শেয়ারে গড়ে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতেও ৩ দশমিক ২ শতাংশ দরপতন হয়েছে। ফলে খাতভেদে বিনিয়োগের ফলাফলে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
একক কোম্পানির শেয়ারদরের পরিবর্তনের দিক থেকেও প্রথমার্ধ ছিল ঘটনাবহুল। এ সময় সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের শেয়ারে। ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৪৩ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৩২৬ শতাংশ।
অন্যদিকে মূল্যপতনের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল বেক্সিমকো। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর কোম্পানিটির শেয়ারের দর প্রায় ৭৩ শতাংশ কমে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে স্থির থাকা অনেক শেয়ারের প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ শুরু হওয়ায় এ ধরনের বড় দরপতন দেখা গেছে।
লেনদেনের দিক থেকেও কয়েকটি কোম্পানি বাজারের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে সিটি ব্যাংকের শেয়ারে। প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ১৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ডমিনোজ স্টিল, যার দৈনিক গড় লেনদেন ১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এরপর রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, যার দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ১৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
আঞ্চলিক তুলনাতেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অবস্থান ছিল ইতিবাচক। প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের প্রধান সূচকে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ রিটার্ন এসেছে। একই সময়ে ভারতের পুঁজিবাজারে রিটার্ন ছিল ১০ দশমিক ২৯ শতাংশ। পাকিস্তানে সূচক বেড়েছে ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। থাইল্যান্ডের বাজারে রিটার্ন ছিল ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার পুঁজিবাজারে এ সময় ১ দশমিক ৬ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমার্ধের এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতিগত স্থিতিশীলতা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসন, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। একই সঙ্গে বাজারে নতুন মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং তারল্যের প্রবাহ অব্যাহত রাখা গেলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধেও পুঁজিবাজারে ইতিবাচক গতি বজায় থাকতে পারে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সুদের হার, মূল্যস্ফীতি এবং দেশীয় অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থাও বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

