২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের পুঁজিবাজারে ফ্রি ফ্লোট শেয়ারের ভিত্তিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূলধনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন—এই সময়ের মধ্যে কোম্পানিগুলোর মোট বাজারমূলধন বেড়েছে ৯ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচিত কিছু বড় ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি, আর্থিক ফলাফলের উন্নতি এবং ব্যাংকিং ও ওষুধ খাতের ইতিবাচক প্রবণতা এ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জুন শেষে ফ্রি ফ্লোটের ভিত্তিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূলধন দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই মূল্য ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ সময় তালিকাভুক্ত ১০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটটির বাজারমূলধন বেড়েছে, আর কমেছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানের।
ফ্রি ফ্লোটের ভিত্তিতে দেশের সবচেয়ে বড় কোম্পানি হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। জুন শেষে কোম্পানিটির বাজারমূলধন বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা, যা ছয় মাস আগে ছিল ১৭ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূলধন বেড়েছে ২ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। ওষুধ খাতের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির কারণে এই অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংকিং খাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি দেখা গেছে ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারে। বছরের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূলধন ছিল ১২ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসে ২ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন হয়েছে, যা আলোচ্য সময়ের অন্যতম বড় বৃদ্ধি।
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজও ইতিবাচক অবস্থান ধরে রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূলধন ডিসেম্বরের ১২ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে জুন শেষে ১৩ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এতে ছয় মাসে প্রায় ৮০৬ কোটি টাকার প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের বাজারমূলধনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বছরের শুরুতে ৪ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা থাকা কোম্পানিটির বাজারমূলধন জুন শেষে ৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূলধন বেড়েছে ১ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা।
ব্যাংকিং খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান পূবালী ব্যাংকের বাজারমূলধনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিসেম্বর শেষে ৪ হাজার ২১ কোটি টাকা থাকা বাজারমূলধন জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকায়। এতে ছয় মাসে ১ হাজার ৭৪১ কোটি টাকার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
একই সময়ে সিটি ব্যাংকের বাজারমূলধনও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূলধন ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ ছয় মাসে কোম্পানিটির মূল্য বেড়েছে ১ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা।
দেশের বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ কোম্পানি গ্রামীণফোনের বাজারমূলধনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ডিসেম্বর শেষে ৩৪ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা থাকা বাজারমূলধন জুন শেষে ৩৫ হাজার ৫৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির মূল্য বেড়েছে ২৩০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ইস্টার্ন ব্যাংকের বাজারমূলধন ৩ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৯৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে ব্যাংকটির বাজারমূলধন বেড়েছে ২১৫ কোটি টাকা।
তবে সব প্রতিষ্ঠানের চিত্র এক রকম নয়। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের বাজারমূলধন ছয় মাসে ১৬১ কোটি টাকা কমেছে। ডিসেম্বর শেষে ৫ হাজার ২৮১ কোটি টাকা থাকা বাজারমূলধন জুন শেষে নেমে এসেছে ৫ হাজার ১২০ কোটি টাকায়।
সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানির বাজারমূলধনে। প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূলধন ডিসেম্বরের ১৩ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা থেকে কমে জুন শেষে ১১ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ফলে মাত্র ছয় মাসে কোম্পানিটির বাজারমূলধন কমেছে ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, নিয়মিত লভ্যাংশ, ভালো করপোরেট সুশাসন এবং স্থিতিশীল ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি রয়েছে—এমন কোম্পানির শেয়ারে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন। বিশেষ করে ব্যাংকিং ও ওষুধ খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে ক্রয়চাপ বাড়ায় তাদের বাজারমূলধন দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
তাঁদের মতে, বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে শুধু কয়েকটি বড় কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আরও বেশি মৌলভিত্তিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে করপোরেট সুশাসন, তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা এবং বাজার তদারকি আরও শক্তিশালী হলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং বাজারমূলধনের প্রবৃদ্ধিও আরও টেকসই হবে।

