শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা দূর করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে ১৭ দফা কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে অতীতে বাজার ধস ও কারসাজির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে ধারাবাহিকভাবে শেয়ারবাজারে ধস নেমে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার কাজ করছে। অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সভাপতিত্ব করেন।
খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারীর পক্ষে পটুয়াখালী-৪ আসনের এক সংসদ সদস্য জানতে চান, আগের সরকারের সময়ে শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনের কারণ কী ছিল এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে সরকারের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, শেয়ারবাজার-সংক্রান্ত অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান চালিয়েছে। তদন্তে কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও কেউ বা কোনো প্রতিষ্ঠান এসব অনিয়মে জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার কাজ অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞ, বিনিয়োগকারী সংগঠন এবং তদন্তকারী সংস্থার মূল্যায়নে দেখা গেছে, বাজার কারসাজি, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো-কমানো, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব, বন্ড ও অন্যান্য ইস্যুতে অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি, আর্থিক তথ্য প্রকাশে অস্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, নীতিগত অসঙ্গতি এবং পুঁজিবাজারবান্ধব করনীতির অভাব—এসব কারণে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, বাজার কারসাজি ও বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মোট ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করেছে। এছাড়া তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিষয়গুলো দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি, সুশাসন নিশ্চিত করা, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসারে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের ঘোষিত ১৭ দফা কর্মপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন পুনর্গঠন, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বড় মূলধনী কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে উৎসাহ দেওয়া, ভালো মৌলভিত্তির প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতের কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনা এবং বাজার কারসাজির তথ্যদাতাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
পরিকল্পনায় আরও রয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ সহজ করা, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বিধিবিধান সংস্কার, একক সিকিউরিটিজ কাস্টডিয়ান সেবা চালু, মূলধনী মুনাফার ওপর কর কমানো, লভ্যাংশ আয়ের ওপর দ্বৈত কর প্রত্যাহার এবং বিও হিসাব খোলা ও মূলধন প্রত্যাবাসনের পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা।
এছাড়া পুঁজিবাজারসংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা করার সুযোগ, পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন ও বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন, ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার, ই-কেওয়াইসির মাধ্যমে অনলাইনে বিও হিসাব ও লেনদেনের সুবিধা, বিনিয়োগবান্ধব করনীতি প্রণয়ন এবং ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে বিও হিসাবে অর্থ জমা ও উত্তোলনের সুযোগ রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারের অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে সুশাসন জোরদার, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল শক্তিশালী করা, পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত আইন যুগোপযোগী করা এবং ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল ও সরকারি সুকুকের লেনদেন স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সম্পন্ন করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

