দীর্ঘদিনের আস্থাসংকট, কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং মানসম্মত কোম্পানির ঘাটতিতে ভুগছে দেশের পুঁজিবাজার। এমন বাস্তবতায় লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সরকারের নতুন পরিকল্পনাকে বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, এই উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু বাজারের আকারই বাড়বে না, বরং বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা, প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং করপোরেট সুশাসন জোরদারের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে তারা একই সঙ্গে সতর্ক করছেন, কেবল ঘোষণা নয়, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়নই এই উদ্যোগের সফলতার মূল শর্ত।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পুঁজিবাজার উন্নয়নে ১৭ দফা অগ্রাধিকার কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বিষয় হলো লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা। পাশাপাশি বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা, কারসাজি দমন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কর-প্রণোদনা এবং কাঠামোগত সংস্কারের কথাও জানানো হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো বড় মূলধনের এবং শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির স্বল্পতা। বর্তমানে তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের বাজার মূলধন সীমিত এবং কিছু কোম্পানির আর্থিক অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। ফলে বড় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা পর্যাপ্ত বিনিয়োগের সুযোগ পান না। এর ফলে বাজারে তারল্য, গভীরতা এবং স্থিতিশীলতা—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অন্যদিকে দেশের অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত মুনাফা করছে। বিশেষ করে জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার, টেলিযোগাযোগ এবং অবকাঠামো খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদভিত্তি শক্তিশালী এবং আয়ও তুলনামূলক স্থিতিশীল। এসব প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে এলে বাজারের গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের ভাষ্য, একটি শক্তিশালী কোম্পানি শুধু নতুন শেয়ার যুক্ত করে না; বরং পুরো বাজারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। উন্নতমানের প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বাজারের প্রতি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক আগেই পুঁজিবাজারে আনা উচিত ছিল। বিলম্ব হলেও বর্তমান উদ্যোগ বাজারকে গতিশীল করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, অতীতেও রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন আবার সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করায় ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তার মতে, সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে বাজারে মানসম্মত শেয়ারের সংখ্যা বাড়বে, বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আসবে এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও শক্তিশালী হবে। তালিকাভুক্তির ফলে আর্থিক প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হবে, যা করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে একাধিক শেয়ার কেলেঙ্কারি, মূল্য কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং নীতিগত অস্থিরতার কারণে লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার থেকে দূরে সরে গেছেন। অনেকের মধ্যে এখনো বাজার নিয়ে অনাস্থা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে তুলনামূলক কম ঝুঁকির বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদানকারী এবং শক্তিশালী আর্থিক অবস্থার কোম্পানিতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু আইন প্রয়োগ বা কারসাজি দমন যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে বাজারে ভালো কোম্পানির সরবরাহও বাড়াতে হবে। কারণ শক্তিশালী কোম্পানিই একটি বাজারের ভিত্তিকে টেকসই করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে কয়েকটি খাতের আধিপত্য থাকলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতের প্রতিনিধিত্ব নেই। যদি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস বা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাজারে আসে, তাহলে নতুন নতুন খাত যুক্ত হবে। এর ফলে বাজার মূলধন বাড়বে, লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং বড় দেশীয় ও বিদেশি তহবিল বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারে। একই সঙ্গে সূচক কয়েকটি নির্দিষ্ট কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল থাকার প্রবণতাও কমবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের আংশিক শেয়ার বিক্রি মানেই রাষ্ট্রীয় মালিকানা হারানো নয়। সরকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেই সাধারণ মানুষকে মালিকানার অংশীদার করতে পারে। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ সম্ভব হবে, সরকারের রাজস্ব আহরণের নতুন পথ তৈরি হবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের বিকল্প উৎস সৃষ্টি হবে।
তাদের মতে, তালিকাভুক্তির ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে, স্বাধীন নিরীক্ষার আওতায় আসতে হবে এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের কাছেও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় আরও বেশি স্বচ্ছতা ও দক্ষতা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরাও সাধারণত বড়, লাভজনক এবং সুশাসনসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগে আগ্রহী হন। সে কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা অবকাঠামো খাতের বড় কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হলে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও এটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে আনলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। প্রথমেই কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর আইন প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার, মূল্য কারসাজি এবং কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানোর মতো অনিয়ম কঠোরভাবে দমন করতে হবে। অন্যথায় শক্তিশালী কোম্পানিও বাজারে এসে প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারবে না।
বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে সরকারি মালিকানাধীন প্রায় ২২টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সমানভাবে সক্রিয় নয় এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাও দুর্বল। অন্যদিকে তিতাস গ্যাস, পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের কাছে শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানি হিসেবে পরিচিত।
সরকার ইতোমধ্যে আরও কয়েকটি লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনার প্রস্তুতি শুরু করেছে। পাশাপাশি কর-সুবিধা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বাজার নজরদারি, ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি আধুনিক, স্থিতিশীল এবং আন্তর্জাতিক মানের পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে কারসাজি দমন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বড় ও মানসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি। লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার উদ্যোগ সেই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে।
তবে তারা মনে করেন, এই পরিকল্পনার সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। যদি স্বচ্ছতা, সুশাসন, স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সঠিক মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করপোরেট পরিচালনা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সরকারি লাভজনক কোম্পানির তালিকাভুক্তি দেশের পুঁজিবাজারে নতুন গতি আনতে পারে। অন্যথায় এটি কেবল আরেকটি ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

