দেশের শেয়ারবাজারে টানা ইতিবাচক ধারার মধ্যে গত সপ্তাহে সূচকের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বাড়তে দেখা গেছে। সপ্তাহজুড়ে লেনদেনের বড় অংশ দখলে ছিল বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলো। মোট লেনদেনের প্রায় ১৮ শতাংশ এই খাতের শেয়ারে হওয়ায় এটি সবচেয়ে সক্রিয় খাত হিসেবে উঠে এসেছে।
একই সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম—উভয় পুঁজিবাজারেই সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল, যা বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও সামগ্রিক সাপ্তাহিক লেনদেন উল্লেখযোগ্য ছিল, তবে দৈনিক গড় লেনদেনে সামান্য নিম্নগতি লক্ষ্য করা গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মোট প্রায় ৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বস্ত্র খাতেই গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২৫৪ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা মোট লেনদেনের প্রায় ১৮ শতাংশের সমান। বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণেই এই খাত সপ্তাহজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল।
সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৬০ পয়েন্ট বা প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৮০৪ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে। আগের সপ্তাহ শেষে সূচকটি ছিল ৫ হাজার ৭৪৪ পয়েন্ট। একই সময়ে নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস-৩০ বেড়ে ২ হাজার ১৭৮ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ২ হাজার ১৬২ পয়েন্ট। অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ২০ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১৮৯ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। আগের সপ্তাহ শেষে এর অবস্থান ছিল ১ হাজার ১৬৯ পয়েন্ট।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে মোট ৩৮৮টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২৫১টির শেয়ারের দাম বেড়েছে, ১২২টির কমেছে এবং ১৫টির দর অপরিবর্তিত ছিল। এছাড়া ২৪টি সিকিউরিটিজে কোনো লেনদেন হয়নি।
বাজারের সার্বিক সূচক বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন এবং জিপিএইচ ইস্পাতের শেয়ার।
যদিও সপ্তাহজুড়ে মোট লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ছিল, তবু দৈনিক গড় লেনদেনে সামান্য কমতি দেখা গেছে। গত সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৩৮৩ কোটি ৮৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ৪৩৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দৈনিক গড় লেনদেন প্রায় ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমেছে।
খাতভিত্তিক লেনদেনের চিত্রে বস্ত্র খাত ছিল স্পষ্টভাবে শীর্ষে। মোট লেনদেনের ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ এই খাতের দখলে ছিল। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সাধারণ বীমা খাতের অংশ ছিল ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। ওষুধ ও রসায়ন খাত ১০ দশমিক ১ শতাংশ লেনদেন নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। প্রকৌশল খাতের অংশ ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত মোট লেনদেনের ৭ দশমিক ১ শতাংশ নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে ছিল।
রিটার্নের দিক থেকেও কয়েকটি খাত উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে ভ্রমণ ও অবকাশ খাতে। এরপর পাট খাতে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ডে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং বস্ত্র খাতে ৪ দশমিক ১ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন পাওয়া গেছে। বিপরীতে ব্যাংক খাতই ছিল একমাত্র খাত, যেখানে সপ্তাহজুড়ে দশমিক ৭ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়লেও বস্ত্র খাতের শেয়ার ঘিরে লেনদেনের চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে ভ্রমণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও পাট খাতেও ইতিবাচক প্রবণতা বাজারে বৈচিত্র্য এনেছে। তবে ব্যাংক খাতের দুর্বল পারফরম্যান্স ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওই খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনও পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
দেশের দ্বিতীয় শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও গত সপ্তাহে ইতিবাচক ধারা বজায় ছিল। এই বাজারের সার্বিক সূচক সিএএসপিআই দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়ে ১৫ হাজার ৫১৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের সপ্তাহে সূচকটির অবস্থান ছিল ১৫ হাজার ৪০৭ পয়েন্ট। একই সময়ে সিএসসিএক্স সূচকও দশমিক ৬০ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার ৭৯৩ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সপ্তাহজুড়ে মোট ১৯০ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের ১৭১ কোটি টাকার তুলনায় বেশি। এ সময়ে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৪৭টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১২৫টির শেয়ারের দাম বেড়েছে, ৯১টির কমেছে এবং ৩১টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
সপ্তাহের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, সূচক বৃদ্ধির পাশাপাশি অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ায় বাজারে ইতিবাচক মনোভাব বজায় রয়েছে। বিশেষ করে বস্ত্র খাতের লেনদেনের আধিপত্য এবং একাধিক খাতে ইতিবাচক রিটার্ন বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে সামনের সপ্তাহগুলোতে বাজারের গতি কতটা টেকসই হবে, সেটিই এখন বিনিয়োগকারীদের প্রধান পর্যবেক্ষণের বিষয়।

