দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে দেশের শেয়ারবাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। গত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া এ ধারা দুই মাসেরও কম সময়ে বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এই সময়ে অর্ধশতাধিক কোম্পানির শেয়ারদর গত এক বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
একই সঙ্গে প্রায় দেড়শ কোম্পানির শেয়ারের দাম গত এক বছরের সর্বনিম্ন অবস্থান থেকে দ্বিগুণ থেকে আট গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে বাজারের এই উত্থানের বড় অংশই দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিকে কেন্দ্র করে হওয়ায় বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে ৪৪টি কোম্পানির শেয়ারদর গত এক বছরের সর্বোচ্চ দামের সমান অথবা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ব্যবধানে অবস্থান করছে। আরও ১৪৩টি কোম্পানির শেয়ার এক বছরের সর্বোচ্চ দরের ১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে গত দুই থেকে ছয় মাসে ৬৮টি কোম্পানির শেয়ারের দাম তাদের এক বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানের তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ থেকে সর্বোচ্চ আট গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া আরও ১২৭টি কোম্পানির শেয়ার ৫০ শতাংশ থেকে প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৩৫৫টি।
শুধু শেয়ারদরই নয়, লেনদেনেও ফিরেছে গতি। গত ছয় সপ্তাহের ২৭ কার্যদিবসের মধ্যে ২৪ দিনই এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর এত দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে এমন উচ্চ লেনদেন দেখা যায়নি। যদিও ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও কয়েকদিন এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছিল, তবে এবার সেই ধারা অনেক বেশি স্থায়ী হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক নীতি, শেয়ারবাজার উন্নয়নের পরিকল্পনা এবং ব্যবসাবান্ধব বাজেট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে অতীতে বাজার কারসাজির সঙ্গে যুক্ত কিছু চক্রও আবার সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে মূল্যসংবেদনশীল তথ্য আগাম ব্যবহার করে ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে কিছু শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকার পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির একটি কার্যকর খাত হিসেবে গড়ে তুলতে আগ্রহী—এমন বিশ্বাস থেকেই বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পুনর্গঠন এবং আইন ও বিধিমালা সহজ করার উদ্যোগও বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে এই উত্থান দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাঁর মতে, এখনও অনেক ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার অবমূল্যায়িত অবস্থায় রয়েছে, অথচ দুর্বল মৌলভিত্তির অনেক শেয়ারেই বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে বীমা ও বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে। এছাড়া প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং জ্বালানি খাতের কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারেও বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে।
এক বছরের সর্বোচ্চ দরের কাছাকাছি অবস্থান করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে এমএল ডাইং, জেনেক্স ইনফোসিস, ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, জাহীনটেক্স, শ্যামপুর সুগার, দ্য পেনিনসুলা, সমরিতা হাসপাতাল, ইউনিক হোটেল, ইস্টার্ন হাউজিং, সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, শাশা ডেনিম, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স, মালেক স্পিনিং, ইভিন্স টেক্সটাইল, রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স এবং আর্গন ডেনিম।
গত এক বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানের তুলনায় সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ডমিনেজ স্টিল কোম্পানির শেয়ারে। গত বছরের জুনে ১০ টাকার নিচে লেনদেন হওয়া এই শেয়ার বর্তমানে ৮১ টাকার বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে। জুন মাসেই এটি ৮৩ টাকা ৮০ পয়সা ছুঁয়েছিল, যা বছরের সর্বোচ্চ। বাজারে আলোচনা রয়েছে, কোম্পানিটির মালিকানায় আকিজ গ্রুপ আসতে পারে—এমন খবরকে কেন্দ্র করে ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
এছাড়া গত ছয় মাসে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের শেয়ারের দাম প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে ১৭০ টাকায় পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারও প্রায় ছয় গুণ বেড়ে ১৭ টাকা থেকে ৯৮ টাকায় উঠেছে। একই সময়ে আইপিও জালিয়াতির অভিযোগে আলোচিত এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের শেয়ার ৪৪ টাকা থেকে বেড়ে ১৪৪ টাকায় পৌঁছেছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শ্যামপুর সুগার কোম্পানির শেয়ারও বড় উত্থান দেখিয়েছে। গত ১৯ মে ১৩৮ টাকায় লেনদেন হওয়া এই শেয়ার গত বৃহস্পতিবার ৩১৯ টাকায় পৌঁছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থান স্পর্শ করে। অথচ কোম্পানিটির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে গত বছর নিট লোকসান ছিল প্রায় ৫১ টাকা।
এক বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানের তুলনায় অন্তত চার গুণ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে বিএফআইসি, রিজেন্ট টেক্স, এপেক্স স্পিনিং, সোনারগাঁও টেক্সটাইল ও প্রাইম ফাইন্যান্সের শেয়ারে। এছাড়া হামিদ ফেব্রিক্স, জিকিউ বলপেন, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, পিপলস লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার অন্তত তিন গুণ বেড়েছে।
এছাড়া ৬০টিরও বেশি কোম্পানির শেয়ারদর দ্বিগুণ থেকে প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স, বিডি থাই ফুড, নাহী অ্যালুমিনিয়াম, দুলামিয়া কটন, সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, আইপিডিসি, উসমানিয়া গ্লাস, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, শাইনপুকুর সিরামিক্স এবং ইয়াকিন পলিমার।
তবে বাজারের চিত্র পুরোপুরি একমুখী নয়। সাম্প্রতিক উত্থানের মধ্যেও ওরিয়ন ইনফিউশন এবং খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার এক বছরের সর্বনিম্ন দামে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব শেয়ারের অনেকগুলোই অতীতে কারসাজির মাধ্যমে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল।
অন্যদিকে, ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এখনও তুলনামূলক কম। ফলে গ্রামীণফোন, ইউনিলিভার কেয়ার এবং রেকিট বেনকাইজারের মতো শক্তিশালী কোম্পানির শেয়ার এখনও এক বছরের সর্বনিম্ন দামের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, বাজারে লেনদেন ও সূচকের ইতিবাচক ধারা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিলেও দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য কারসাজির অভিযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তাই বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নজরদারি আরও জোরদার করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদেরও মৌলভিত্তি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

