ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও কোম্পানিগুলোকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও এবং রিপিট পাবলিক অফারিং বা আরপিও করার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বৃহস্পতিবার বিভিন্ন কোম্পানি ও শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের খসড়া বিধিমালা এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সুবিধা সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের জানাতে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
বর্তমান খসড়া বিধিমালায় ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের পর কোনো কোম্পানির আইপিও বা আরপিও করার সুযোগ রাখা হয়নি। বৈঠকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বিষয়টি তুলে ধরলে খসড়ায় প্রয়োজনীয় বিধান যুক্ত করার কথা জানায় বিএসইসি।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) মহাসচিব সুমিত পোদ্দার বলেন, ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের পর আইপিও বা আরপিও করার সুযোগ দিতে খসড়া বিধিমালায় একটি বিধান যুক্ত করা হবে।
ডাইরেক্ট লিস্টিং ব্যবস্থায় কোনো কোম্পানির উদ্যোক্তা বা স্পনসররা পাবলিক অফারের মাধ্যমে নতুন শেয়ার ছাড়ার পরিবর্তে নিজেদের হাতে থাকা শেয়ার সরাসরি বাজারে স্থানান্তর করবেন। শেয়ার বিক্রির অর্থও তারা সরাসরি নিজেদের হিসাবে পাবেন। এর ফলে উদ্যোক্তারা নিজেদের বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবেন এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও কোম্পানিটির মালিকানায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের নির্ধারিত ফ্লোর প্রাইসের চেয়ে বেশি দামে দর প্রস্তাব করতে হবে। এই ফ্লোর প্রাইস কোম্পানির নির্ধারিত রেফারেন্স দামের চেয়ে অন্তত ২০ শতাংশ কম হবে।
বৈঠকে কয়েকজন অংশগ্রহণকারী ‘ফ্লোর প্রাইস’ শব্দটি পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। তাদের মতে, দেশের সেকেন্ডারি শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার সঙ্গে শব্দটি বেশি সম্পর্কিত। ওই ব্যবস্থার কারণে একসময় শেয়ারবাজারে লেনদেন স্থবির হয়ে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছিল।
ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে স্থানান্তর করা শেয়ারের ওপর খসড়া বিধিমালায় এক বছরের লক-ইন রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এই লক-ইনের মেয়াদ আরও বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে বৈঠকে জানিয়েছে বিএসইসি।
পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খানের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন ইতোমধ্যে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের খসড়া বিধিমালা অনুমোদন করেছে। এতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, আইসিটি অবকাঠামো সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, বিদেশি কোম্পানি এবং যেসব কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার বা মোট সম্পদের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা, তাদের ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ইউনিলিভার, মেটলাইফ, নেসলে বাংলাদেশ, বাংলালিংক, বিকাশ, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, এসেনশিয়াল ড্রাগস ও নগদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মেঘনা, প্রাণ-আরএফএল, ডিবিএল, আবুল খায়ের, ইউনিক, কাজী ফার্মস ও কনফিডেন্সসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি ও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে বিএসইসির পক্ষ থেকে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের খসড়া বিধিমালার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা হলে বাজার ও কোম্পানি—উভয় পক্ষই লাভবান হবে। এতে একদিকে পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়বে, অন্যদিকে কোম্পানিগুলো সুনাম, ব্র্যান্ড মূল্য, যথাযথ মূল্যায়ন এবং কর সুবিধা পেতে পারে।
তিনি বলেন, উত্তরসূরিদের জন্য মালিকানা ও তারল্য ব্যবস্থাপনা সহজ করার পাশাপাশি ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি ভবিষ্যতে অতিরিক্ত মূলধন সংগ্রহের সুযোগও তৈরি করে।
স্থানীয় ও বিদেশি বাজারে তালিকাভুক্তির উদাহরণ হিসেবে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের কথা উল্লেখ করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। স্থানীয় শেয়ারবাজারের পাশাপাশি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের একটি প্ল্যাটফর্মে কোম্পানিটির তালিকাভুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ভালো সুনামসম্পন্ন কোম্পানির উদ্যোক্তারা এমন দ্বৈত তালিকাভুক্তির পর স্থানীয় ও বিদেশি—উভয় বাজারেই শেয়ার বিক্রির সুযোগ পেতে পারেন।
বিএসইসির কমিশনার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বৈঠকে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

