বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা বা কার্যক্রমহীন কোম্পানিগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে তালিকাচ্যুত (ডিলিস্টিং) করা হচ্ছে—এমন তথ্য সঠিক নয় বলে স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
কমিশনের ভাষ্য, এ ধরনের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
রোববার (১২ জুলাই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএসইসি জানায়, সম্প্রতি একটি মতবিনিময় সভায় কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। বিশেষ করে বন্ধ কোম্পানিগুলোকে দ্রুত তালিকাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে কমিশন দাবি করেছে।
বিএসইসির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বিশ্বের অধিকাংশ পুঁজিবাজারে দীর্ঘ সময় ধরে কার্যক্রমহীন অবস্থায় থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানকে অনির্দিষ্টকাল তালিকাভুক্ত রাখা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে বহু বছর ধরে উৎপাদন বা ব্যবসা বন্ধ থাকা কয়েকটি কোম্পানি এখনও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর ফলে বিশেষ করে সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্তির পাশাপাশি আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
কমিশনের মতে, এ ধরনের কোম্পানির বিষয়ে প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের। সেই দায়িত্বের অংশ হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ বিষয়টি পর্যালোচনা করছে এবং কীভাবে একটি স্বচ্ছ, যৌক্তিক ও বিনিয়োগবান্ধব প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে।
বিএসইসি জানিয়েছে, আলোচনায় এমন একটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে, যার আওতায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমা, যেমন এক বছরের মধ্যে উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরায় চালুর সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে না পারলে তখন বিদ্যমান আইন, তালিকাভুক্তি বিধিমালা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য নিয়ম অনুসারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কোনো কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপরই নয়, সেই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারধারী হাজারো বিনিয়োগকারীর ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কোম্পানিকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া হলে একদিকে যেমন ব্যবসা সচল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির ঝুঁকিও কিছুটা কমতে পারে।
একই সঙ্গে বিএসইসি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কমিশনের মতে, যেসব কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছে না, প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে, নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজন করে না কিংবা শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রদান থেকে বিরত থাকে—এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগের আগে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, কার্যক্রমহীন কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন তালিকাভুক্ত থাকলে বাজারের স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে শেয়ারের লেনদেনের মধ্যে অসঙ্গতি তৈরি হতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হন এবং বাজারের প্রতি আস্থাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই একদিকে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা, অন্যদিকে বাজারের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিএসইসি স্পষ্ট করেছে, বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো তাৎক্ষণিক বা গণহারে তালিকাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেই। বরং সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যায়ন, আইনগত প্রক্রিয়া এবং কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালুর সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

