দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট হচ্ছে। দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার থেকে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধীরে ধীরে সরে গিয়ে মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও ভালো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারের সূচক ও লেনদেনে।
নতুন সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার (১২ জুলাই) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণ পৌঁছেছে প্রায় দুই বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
একই দিনে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) মূল্যসূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় ছিল। সেখানে বেশিরভাগ শেয়ারের দাম বাড়লেও লেনদেনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ধরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে দুর্বল ও জল্পনানির্ভর শেয়ারে বেশি লেনদেন হতো, এখন বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে শক্তিশালী ও নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দিকে ঝুঁকছেন। এ প্রবণতা বাজারকে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, গত এক বছরে দেশের প্রধান শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক প্রায় এক হাজার পয়েন্ট বেড়েছে। এটি শুধু সংখ্যাগত অগ্রগতি নয়, বরং বাজারের কাঠামোগত পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করছে। দীর্ঘ সময় পর কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক ভিত্তি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে বাজারের মূল্যায়নের একটি সামঞ্জস্য তৈরি হতে শুরু করেছে।
তাদের মতে, বর্তমানে বাজারে এক ধরনের পরিপক্বতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর অন্যতম লক্ষণ হলো, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা দুর্বল বা ‘জেড’ শ্রেণিভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের প্রতি আগ্রহ কমছে। অন্যদিকে ভালো ব্যবস্থাপনা, স্থিতিশীল আয় এবং সম্ভাবনাময় ব্যবসা রয়েছে—এমন কোম্পানির শেয়ারের চাহিদা বাড়ছে। ফলে বাজারে অস্বাভাবিক ওঠানামার পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর লেনদেনের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে এখনও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। পাশাপাশি অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী দ্রুত মুনাফার আশায় স্বল্পমেয়াদি লেনদেনে বেশি আগ্রহী হওয়ায় ভালো কোম্পানির শেয়ার দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখার প্রবণতা তুলনামূলক কম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বল কোম্পানির প্রতি আগ্রহ কমে মাঝারি ও ভালো মানের কোম্পানির দিকে বিনিয়োগ বাড়ছে, যা বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাজার ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে। লেনদেনের পরিমাণও সেই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করছে। এখন যে পরিমাণ লেনদেন হচ্ছে, সেটিকে বাজারের স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত পর্যায় হিসেবে দেখা যেতে পারে।
দিনের শুরু থেকেই ডিএসইতে ক্রয়চাপ ছিল স্পষ্ট। লেনদেনের শুরুতে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারা আরও শক্তিশালী হয় এবং শেষ পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান ধরে রেখেই দিনের লেনদেন শেষ হয়।
রোববার ডিএসইতে মোট ৩৯২টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ১৯৯টির দর বেড়েছে, ১৫৬টির দর কমেছে এবং ৩৭টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ায় প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪৫ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৪৯ পয়েন্টে। শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস ৩ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১৯২ পয়েন্টে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে নির্বাচিত ৩০টি ভালো কোম্পানির শেয়ার নিয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক ২৩ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ২০১ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।
সূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও বড় ধরনের গতি দেখা গেছে। এদিন ডিএসইতে মোট ১ হাজার ৬৬৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট হাতবদল হয়েছে। আগের কার্যদিবস বৃহস্পতিবার লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৪২৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ফলে এক কার্যদিবসের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ২৪১ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
এ দিনের লেনদেন ২০২৪ সালের ১১ আগস্টের পর সর্বোচ্চ। ওই দিন ডিএসইতে ২ হাজার ১০ কোটি ৯ লাখ টাকার শেয়ার ও সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছিল। সেই হিসাবে প্রায় এক বছর ১১ মাসের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় লেনদেন।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও দিনটি ছিল ইতিবাচক। মোট ২৬৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৪টির দর বেড়েছে, ৯৪টির কমেছে এবং ১৭টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
দিন শেষে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৭৭ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৫৯৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এ বাজারে মোট লেনদেন হয়েছে ১০ কোটি ১১ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৪৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যদি মৌলভিত্তিক কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী হয়, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

