দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রায় দুই বছর পর সূচক, লেনদেন এবং শেয়ার হাতবদলে উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা গেছে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে বাজারে ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।
একই দিনে প্রায় ৫২ কোটি ৭০ লাখ শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা গত ২৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নেতৃত্ব পরিবর্তন, নীতিগত সংস্কারের বার্তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির কারণে বাজারে নতুন গতি ফিরেছে।
রোববারের লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪৫ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৮৪৯ পয়েন্টে অবস্থান করে। সূচকের এই অবস্থানও সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৩ মাস আগে, ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট সর্বশেষ এক দিনে ২ হাজার ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল এবং ৭৬ কোটি শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়। আর ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট ডিএসইএক্স সূচক ৫ হাজার ৯০৪ পয়েন্টে পৌঁছেছিল, যা ওই সময়ের সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি বছরের ৪ জুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বাজারকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে একাধিক নীতিগত উদ্যোগ এবং সংস্কারের বার্তা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা অনেক বিনিয়োগকারী আবারও বাজারে সক্রিয় হয়েছেন।
তাঁদের মতে, শুধু ব্যক্তি বিনিয়োগকারী নয়, প্রাতিষ্ঠানিক এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও আগের তুলনায় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের চাহিদা ও লেনদেনে।
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এদিন সূচক বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে ব্র্যাক ব্যাংক, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, পূবালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, আইডিএলসি, সিটি ব্যাংক, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, সামিট পাওয়ার এবং লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার। এই ১০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধির কারণে একাই সূচকে প্রায় ৩২ পয়েন্ট যোগ হয়েছে।
লেনদেনের দিক থেকেও এগিয়ে ছিল কয়েকটি বড় কোম্পানি। এর মধ্যে লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ারে প্রায় ৭০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা দিনের সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের শেয়ারে, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।
ডিএসইর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এদিন দরবৃদ্ধির শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩টি ছিল বিমা খাতের এবং ৭টি ছিল মিউচুয়াল ফান্ড। বিশ্লেষকদের মতে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য কর-সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং এ খাতকে আরও শক্তিশালী করতে বিএসইসির বিভিন্ন পরিকল্পনার কারণে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে।
অন্যদিকে, দরপতনের তালিকায় স্থান পেয়েছে তুলনামূলক দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো। বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, শেয়ার কারসাজি প্রতিরোধে নজরদারি জোরদার করা এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বা দুর্বল কোম্পানিগুলোকে তালিকাচ্যুত করার বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর অবস্থানের কারণে এসব শেয়ার থেকে বিনিয়োগকারীরা সরে আসছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বাজারে নীতিগত স্থিতিশীলতা, কার্যকর নজরদারি এবং স্বচ্ছতা বজায় থাকলে সামনের দিনগুলোতেও পুঁজিবাজারে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে একই সঙ্গে তাঁরা বিনিয়োগকারীদের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ এবং গুজব বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

