দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) তাদের বহুল আলোচিত ডিএস৩০ সূচকের অর্ধবার্ষিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করেছে। নতুন সমন্বয়ের ফলে ইস্পাত খাতের বিএসআরএম লিমিটেড, ওষুধশিল্পের দি একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড এবং রাষ্ট্রায়ত্ত পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে কোহিনূর কেমিক্যালস কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস পিএলসি এবং লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেড এই সূচক থেকে বাদ পড়ছে।
ডিএসই রোববার (১২ জুলাই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, নতুন এই পরিবর্তন আগামী ১৯ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক সূচক প্রণয়নকারী এসঅ্যান্ডপি ডাও জোন্স ইনডেক্সেসের সহযোগিতায় প্রণীত সূচক কাঠামো অনুসরণ করেই এই পুনর্গঠন করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে ডিএস৩০ সূচককে সাধারণত সবচেয়ে শক্তিশালী, বেশি লেনদেনযোগ্য এবং বিনিয়োগযোগ্য ৩০টি কোম্পানির প্রতিনিধিত্বকারী সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে বাজারসংশ্লিষ্টদের কাছে এটি ‘এলিট ক্লাব’ বা ব্লু-চিপ কোম্পানির সূচক হিসেবেই বেশি পরিচিত। দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, সম্পদ ব্যবস্থাপক এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ তহবিল বাজার বিশ্লেষণে এই সূচককে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, বছরে দুইবার সূচকটি পর্যালোচনা করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো বাজারে সক্রিয়, আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং পর্যাপ্ত লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোকে সূচকে রাখা, যাতে বিনিয়োগকারীরা বাজারের প্রকৃত চিত্র সহজে মূল্যায়ন করতে পারেন।
ডিএস৩০ সূচকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য একটি কোম্পানিকে একাধিক যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে অন্তত ৫০ কোটি টাকার ফ্রি-ফ্লোট বাজার মূলধন, আগের তিন মাসে দৈনিক গড়ে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন এবং সর্বশেষ ১২ মাসে নিট মুনাফায় থাকা। তবে আগে থেকেই সূচকে থাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দৈনিক গড় লেনদেনের ন্যূনতম সীমা ৩০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া খাতভিত্তিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ডিএসই একটি নির্দিষ্ট শিল্পখাত থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি কোম্পানিকে এই সূচকে অন্তর্ভুক্ত রাখার নীতি অনুসরণ করে। এর ফলে সূচকে বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় এবং কোনো একটি খাতের অতিরিক্ত প্রভাব কমানো সম্ভব হয়।
তবে সূচকের সর্বশেষ তালিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নও উঠেছে। কারণ, বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কিছু নন-কমপ্লায়েন্ট বা বিধি লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠান এখনো ডিএস৩০ সূচকে অবস্থান করছে, যা সূচকের গ্রহণযোগ্যতা ও মান নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
উদাহরণ হিসেবে ফাইন ফুডস লিমিটেডের বিষয়টি উল্লেখ করা হচ্ছে। কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে বর্তমানে মোট শেয়ারের মাত্র ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ রয়েছে। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধি অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিত শেয়ার ধারণ ন্যূনতম ৩০ শতাংশ হওয়া বাধ্যতামূলক। এই শর্ত পূরণ না করেও প্রতিষ্ঠানটি ডিএস৩০ সূচকে রয়েছে।
একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে লংকাবাংলা ফাইন্যান্স পিএলসিকে ঘিরেও। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের পর আর কোনো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। ফলে ২০২৫ সালের শেষাংশ এবং ২০২৬ সালের প্রথম দুই প্রান্তিকে কোম্পানিটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বিষয়ে বিনিয়োগকারীরা নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছেন না। তারপরও প্রতিষ্ঠানটি ডিএস৩০ সূচকে স্থান ধরে রেখেছে।
একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউসের একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ব্লু-চিপ সূচকের প্রতি বিনিয়োগকারীদের স্বাভাবিকভাবেই উচ্চ আস্থা থাকে। কিন্তু নিয়ম না মানা বা আর্থিক স্বচ্ছতায় পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান যদি এই তালিকায় থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হতে পারেন এবং সূচকের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তাঁর মতে, এই কারণেই অনেক পেশাদার তহবিল ব্যবস্থাপক বিনিয়োগ পোর্টফোলিও তৈরির সময় ডিএস৩০ সূচককে পুরোপুরি অনুসরণ করেন না। বাজারের সেরা কোম্পানিগুলোর সূচকে কেবল সেই প্রতিষ্ঠানগুলোরই স্থান পাওয়া উচিত, যারা আর্থিক স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব শর্ত যথাযথভাবে মেনে চলে।
এসব সমালোচনার বিষয়ে ডিএসইর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমানে সংস্থাটি এসঅ্যান্ডপি ডাও জোন্সের নির্ধারিত গাণিতিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে বাধ্য। বিদ্যমান কাঠামো অনুযায়ী বাজার মূলধন, লেনদেনের পরিমাণ ও মুনাফার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলেই কোনো কোম্পানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সূচকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সূচক পদ্ধতিতে প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের নির্দিষ্ট সময়সীমা বিবেচনার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান পুরোনো আর্থিক তথ্যের ভিত্তিতেই সূচকে টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। তবে এই সীমাবদ্ধতার বিষয়ে ডিএসই অবগত রয়েছে এবং ভবিষ্যতে সূচককে আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে কমপ্লায়েন্স, কর্পোরেট সুশাসন এবং তথ্য প্রকাশসংক্রান্ত নতুন মানদণ্ড যুক্ত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০১৩ সালে এক হাজার ভিত্তি পয়েন্ট নিয়ে যাত্রা শুরু করা ডিএস৩০ বর্তমানে দেশের বড় মূলধনের কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্স মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান সূচক। বাজার বিশ্লেষণ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন সূচকভিত্তিক তহবিল পরিচালনায় এটি এখনো সবচেয়ে বেশি অনুসৃত বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

