পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ও অর্থ আত্মসাতের ঝুঁকি কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন উদ্যোগের আওতায় প্রতিটি শেয়ার লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীর মোবাইল ফোন ও ই-মেইলে স্বয়ংক্রিয় বার্তা পাঠানো হবে। একই সঙ্গে সব ব্রোকারেজ হাউসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) অনুমোদিত ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, অতীতে কিছু ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান অনুমোদনহীন বা ডুপ্লিকেট ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে গ্রাহকদের প্রকৃত হিসাব গোপন করেছে। এসব সফটওয়্যারে তথ্য পরিবর্তনের সুযোগ থাকায় শেয়ার বিক্রি, হিসাব জালিয়াতি এবং অর্থ আত্মসাতের মতো অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা বন্ধে এখন থেকে শুধুমাত্র ডিএসই অনুমোদিত সফটওয়্যার ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে।
বর্তমানে ডিএসইর অনুমোদিত সাতটি ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব সফটওয়্যারে লেনদেন-সংক্রান্ত তথ্য পরিবর্তনের সুযোগ নেই। ফলে ভুয়া হিসাব তৈরি, তথ্য গোপন বা গ্রাহকের অজান্তে শেয়ার স্থানান্তরের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।
ডিএসইর পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সাতটি ব্রোকারেজ হাউস বিভিন্ন অনিয়ম ও ভুয়া সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রায় ৪৫ হাজার বিনিয়োগকারীর ৫৬০ কোটির বেশি টাকার শেয়ার ও অর্থ আত্মসাত করেছে। তদন্তে গ্রাহকদের অজান্তে শেয়ার বিক্রি, হিসাব গোপন এবং অর্থ সরিয়ে নেওয়ার নানা কৌশলের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে কয়েকটি নতুন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রতিটি লেনদেনের পর তাৎক্ষণিকভাবে এসএমএস ও ই-মেইলের মাধ্যমে গ্রাহককে তথ্য জানানো হবে। পাশাপাশি সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করবে, যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা যেকোনো সময় তাদের বিও হিসাবে থাকা শেয়ার ও লেনদেনের হালনাগাদ তথ্য দেখতে পারবেন।
এ ছাড়া ব্রোকারেজ হাউস, ব্যাংক এবং সিডিবিএলের তথ্যের মধ্যে কোনো অমিল না থাকে, সে জন্য এপিআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় তথ্য সমন্বয় বা অটোমেটেড রিকনসিলিয়েশন ব্যবস্থা চালু করা হবে। এই ব্যবস্থায় তথ্য পরিবর্তন বা গোপন করার সুযোগ অনেকটাই সীমিত হবে।
নতুন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিনিয়োগকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর এবং ই-মেইল ঠিকানার তথ্যও কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছামতো এসব তথ্য পরিবর্তন করতে পারবে না।
সম্প্রতি একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে শত কোটি টাকার বেশি শেয়ার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সামনে আসার পর প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি। কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন পদক্ষেপগুলো কার্যকর হলে গ্রাহকের অজান্তে শেয়ার বিক্রি, ভুয়া হিসাব তৈরি এবং অর্থ আত্মসাতের মতো অনিয়ম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান সম্প্রতি জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারে কারসাজি ও জালিয়াতি শনাক্তে আগামী এক বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হবে। গুরুতর জালিয়াতির ঘটনায় শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন হলে ফৌজদারি মামলাও করা হবে।
এ বিষয়ে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, অতীতের অনিয়মগুলো পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে একটি বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করা হচ্ছে। এটি চালু হলে কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ) রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে এবং প্রতিদিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাবের সমন্বয় করা হবে। কোনো অমিল ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা দেওয়া হবে, যা দ্রুত জবাবদিহি নিশ্চিত এবং তদারকি কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে সহায়তা করবে।

