পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাকে আরও সহজ, কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব করতে বিদ্যমান বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মার্জিন ঋণের অনুপাত, মার্জিন কল, ঋণ বিতরণের সীমা, মার্জিনযোগ্য শেয়ার নির্বাচন এবং বিনিয়োগকারীদের ওপর থাকা বেশ কয়েকটি শর্তে পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে খসড়া বিধিমালা প্রকাশ করে অংশীজন ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতামত আহ্বান করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
রোববার বিএসইসির ওয়েবসাইটে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’–এর সংশোধনী খসড়া প্রকাশ করা হয়। এর আগে কমিশনের ১০২০তম সভায় খসড়াটি নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিএসইসি বলছে, বর্তমান মার্জিন ঋণ বিধিমালায় থাকা বিভিন্ন শর্ত ও সীমাবদ্ধতার কারণে বিনিয়োগকারী, ব্রোকারেজ হাউস এবং মার্জিন ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তব ক্ষেত্রে নানা জটিলতার মুখে পড়ছে। এসব সমস্যা দূর করে বাজারে তারল্য বাড়ানো, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতেই এই সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খসড়া সংশোধনী অনুযায়ী, গ্রাহকের নিজস্ব মূলধন (ইকুইটি) ও মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ অনুপাত সব ক্ষেত্রে ১:১ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এই অনুপাত ১:১, ১:০.৫ অথবা ১:০.২৫ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে সব বিনিয়োগকারীর জন্য একই সর্বোচ্চ সীমা প্রযোজ্য হবে। তবে কোনো মার্জিন ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজস্ব ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে এর চেয়ে কম ঋণ দিতে পারবে, কিন্তু ১:১-এর বেশি অর্থায়ন করতে পারবে না।
বাজারে তারল্য বাড়াতে মার্জিন ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানের কোর ক্যাপিটাল বা নিট সম্পদের সর্বোচ্চ তিন গুণ পর্যন্ত মার্জিন ঋণ বিতরণের সুযোগ রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে সেই সীমা বাড়িয়ে পাঁচ গুণ করার কথা বলা হয়েছে। বিএসইসির মতে, এতে বাজারে বিনিয়োগ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
মার্জিন কলের নিয়মেও পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে গ্রাহকের ইকুইটি ৭৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে মার্জিন কল দেওয়া হয়। সংশোধিত খসড়ায় এই সীমা ৭০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে গ্রাহকের ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে বাধ্যতামূলকভাবে শেয়ার বিক্রির বিদ্যমান বিধান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
মার্জিনযোগ্য শেয়ার নির্বাচনের নীতিতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে আর মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) বিবেচনা করা হবে না। এর পরিবর্তে মূল্য-সম্পদ অনুপাত (পিবি রেশিও) ব্যবহার করা হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পিবি রেশিও ৩-এর বেশি এবং বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে ১-এর বেশি হলে সেই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মার্জিন সুবিধার আওতায় থাকবে না।
অন্যদিকে অন্যান্য খাতের কোম্পানির ক্ষেত্রে পিই রেশিও বহাল থাকলেও এর হিসাবের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে সর্বশেষ চার প্রান্তিকের আয়ের ভিত্তিতে পিই রেশিও নির্ধারণ করা হলেও নতুন বিধানে সর্বশেষ নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বি ক্যাটাগরির শেয়ার নিয়ে বিদ্যমান শর্তও শিথিল করা হচ্ছে। আগে কমপক্ষে ৫ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদানকারী বি ক্যাটাগরির শেয়ারই মার্জিন ঋণের জন্য যোগ্য ছিল। নতুন প্রস্তাবে এই শর্ত বাতিল করে এ এবং বি—উভয় ক্যাটাগরির সব শেয়ারকে মার্জিনযোগ্য করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বর্তমান বিধিমালার বেশ কয়েকটি শর্ত সম্পূর্ণ বাতিলের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সামগ্রিক বাজারের পিই রেশিওর ভিত্তিতে মার্জিন অনুপাত কমানোর বিধান, গত এক বছরে গড়ে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ থাকার শর্ত, ৫০ কোটি টাকা ফ্রি-ফ্লোট বাজারমূলধনের শর্ত, শিক্ষার্থী, গৃহিণী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মার্জিন ঋণ গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা এবং ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি কমপ্লায়েন্স–সংক্রান্ত বিধান।
চুক্তি নবায়নের নিয়মেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি বছর মার্জিন চুক্তি নবায়ন করতে হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো পক্ষ চুক্তি বাতিল না করলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হয়েছে বলে গণ্য হবে। এতে বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক জটিলতা কমবে বলে মনে করছে কমিশন।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, সংশোধনীর মূল লক্ষ্য হলো মার্জিন ঋণ ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগে যে জটিলতাগুলো রয়েছে, সেগুলো দূর করা। বিধিমালাকে আরও সহজ, কার্যকর এবং বিনিয়োগকারীবান্ধব করতে এই পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হলে মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও নমনীয় হবে, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং পুঁজিবাজারে তারল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি লেনদেনও ইতিবাচক প্রভাব পেতে পারে। তবে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

