পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত, ঝুঁকিনির্ভর ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষাবান্ধব করতে বিদ্যমান বিধিমালায় ব্যাপক পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মার্জিন ঋণ গ্রহণ, মার্জিন কল, বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রি, যোগ্য সিকিউরিটি নির্বাচন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় একাধিক নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাহকের ইক্যুইটি নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে গেলে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’–এর খসড়া সংশোধনীতে বলা হয়েছে, গ্রাহকের ইক্যুইটি সব সময় মার্জিন অর্থায়নের অন্তত ৭০ শতাংশ বজায় রাখতে হবে। কোনো কারণে ইক্যুইটি এই সীমার নিচে নেমে গেলে সংশ্লিষ্ট মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত নোটিশ, নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর, ই-মেইল অথবা প্রয়োজন হলে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে মার্জিন কল দিতে হবে।
খসড়া অনুযায়ী, মার্জিন কল পাওয়ার পরও যদি তিন কার্যদিবসের মধ্যে গ্রাহক প্রয়োজনীয় অর্থ বা সিকিউরিটি যোগ করে ইক্যুইটি ৭০ শতাংশে উন্নীত করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাকে নতুন কোনো মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ইক্যুইটি পুনঃস্থাপনের জন্য তার হিসাবে থাকা প্রয়োজনীয় সংখ্যক শেয়ার বিক্রির ক্ষমতা থাকবে মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের।
আরও কঠোর বিধান রাখা হয়েছে ইক্যুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে। সে ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অতিরিক্ত নোটিশ ছাড়াই গ্রাহকের হিসাবে থাকা প্রয়োজনীয় সংখ্যক শেয়ার বাধ্যতামূলকভাবে বিক্রি করতে পারবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। বাজার পরিস্থিতির কারণে বিক্রিতে বিলম্ব হলে বা তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি সম্ভব না হওয়ায় ক্ষতি হলে সেই দায় মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তাবে না বলেও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্জিন ঋণের পরিমাণ নির্ধারণেও নতুন সীমা প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের নিজস্ব ইক্যুইটির চেয়ে বেশি মার্জিন অর্থায়ন দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ ইক্যুইটি ও মার্জিন অর্থায়নের সর্বোচ্চ অনুপাত হবে ১:১। তবে তালিকাভুক্ত জীবন বিমা কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে এই অনুপাত সর্বোচ্চ ১:০.২৫ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে আরও রক্ষণশীল নীতি।
মার্জিন ঋণ পাওয়ার জন্যও নতুন যোগ্যতার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, কোনো বিনিয়োগকারীর হিসাবে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিতে কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ না থাকলে তিনি মার্জিন ঋণের সুবিধা পাবেন না। এছাড়া শুধু স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত নির্দিষ্ট শেয়ারেই মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে।
একই সঙ্গে উচ্চ ঝুঁকির বিভিন্ন শ্রেণির সিকিউরিটিকে মার্জিন সুবিধার বাইরে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘জি’, ‘এন’ ও ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ার এবং এসএমই, এটিবি ও ওটিসি প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিতে মার্জিন অর্থায়ন দেওয়া যাবে না।
কোন শেয়ার মার্জিন ঋণের জন্য উপযুক্ত হবে, সে ক্ষেত্রেও আর্থিক সূচকের ভিত্তিতে নতুন মানদণ্ড নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানির মূল্য-আয় (পিই) অনুপাত ৩০-এর বেশি হলে অথবা কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ঋণাত্মক হলে সেই শেয়ারে মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না।
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পিই অনুপাতের পরিবর্তে প্রাইস-টু-বুক (পিবি) অনুপাত বিবেচনা করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের পিবি অনুপাত ৩-এর বেশি হলে এবং বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিবি অনুপাত ১-এর বেশি হলে সেই শেয়ার মার্জিন অর্থায়নের জন্য অযোগ্য হবে।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে প্রতিটি মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম দুই সদস্যের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকি বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে কোনো প্রতিষ্ঠান তার মোট মার্জিন অর্থায়নের ২০ শতাংশের বেশি একটি শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারবে না। একইভাবে কোনো একক গ্রাহকের মার্জিন ঋণের ২০ শতাংশের বেশি একটি সিকিউরিটিতে কেন্দ্রীভূত করা যাবে না।
বিএসইসি জানিয়েছে, এটি এখনো একটি খসড়া বিধিমালা। এ বিষয়ে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং অংশীজনদের মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কমিশনে জমা দিতে হবে। প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জনের পর বিধিমালার চূড়ান্ত সংস্করণ সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কার্যকর হলে মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বিনিয়োগ কমবে এবং উচ্চ ঝুঁকির শেয়ারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরির প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তবে নতুন বিধান কার্যকর হলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য মার্জিন সুবিধা গ্রহণ তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।

