দেশের শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণ নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি। বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার জন্য দেওয়া মোট ১৬ হাজার ৪০ কোটি টাকার মার্জিন ঋণের বিপরীতে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা এখন ঋণাত্মক ইক্যুইটিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, শেয়ারের দাম পড়ে যাওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারীর নিজস্ব মূলধন শেষ হয়ে গেছে, পাশাপাশি ঋণের বড় অংশও অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস শেষে দেশের ১০৫টি ব্রোকারেজ হাউস এবং ৪১টি মার্চেন্ট ব্যাংক গ্রাহকদের শেয়ার কেনার জন্য এই মার্জিন ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে ঋণাত্মক ইক্যুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। এ অর্থের মধ্যে মূল ঋণ রয়েছে ৭ হাজার ৮২০ কোটি টাকা এবং স্থগিত সুদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা।
শেয়ারবাজারে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই মার্জিন ঋণ নীতিমালা আরও সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। গত ১৯ জুলাই প্রকাশিত সংশোধনী প্রস্তাব ঘিরে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাজারের বিভিন্ন পক্ষ বলছে, মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাপনায় একদিকে অতিরিক্ত কঠোরতা যেমন বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে পারে, অন্যদিকে অতিরিক্ত শিথিলতাও নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং বাজারে তারল্য বৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এর আগে মার্জিন ঋণ বিধিমালায় এমন কিছু কঠোর শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল, যার কারণে অনেক ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের জন্য এ সুবিধা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে নতুন প্রস্তাবে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত ১০২টি ব্রোকারেজ হাউসের নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। এসব প্রতিষ্ঠান ৯৬ হাজার ৬১২টি মার্জিন হিসাবে মোট ৯ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের তিনটি ব্রোকারেজ হাউস ৫ হাজার ৭২১ বিনিয়োগকারীকে মোট ৩২ কোটি টাকা মার্জিন ঋণ দিয়েছে। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণাত্মক ইক্যুইটির পরিমাণ প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ৪১টি মার্চেন্ট ব্যাংক ২৯ হাজার ১৯১টি হিসাবে মোট ৬ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা মার্জিন ঋণ দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৯২০ কোটি টাকা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মার্জিন ঋণ সাধারণত বিনিয়োগকারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায় এবং বাজারে লেনদেনের গতি বাড়াতে সহায়তা করে। তবে শেয়ারদর ব্যাপকভাবে কমে গেলে একই ঋণ বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তারা বলেন, ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের অন্যতম আলোচিত কারণগুলোর একটি ছিল অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ নির্ভরতা। ওই সময় অনেক মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে নীতিমালা সংশোধনের ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, মূলধন পর্যাপ্ততা নিশ্চিত না করেও ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংক মার্জিন ঋণ দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। বর্তমানে এ ধরনের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পাশাপাশি, ‘বি’ শ্রেণির শেয়ারকে মার্জিনযোগ্য করার ক্ষেত্রেও শর্ত শিথিল করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকে। তাদের মতে, কম লভ্যাংশ দেওয়া বা দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারকে মার্জিন ঋণের আওতায় আনা হলে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে কারসাজির সুযোগ বাড়তে পারে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আগের কমিশনের করা মার্জিন ঋণ বিধিমালা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। নতুন কমিশন সেটিকে সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রয়োজন ছিল। তবে প্রস্তাবিত পরিবর্তনে অতিরিক্ত উদারতা দেখানো হলে তা বাজারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, সামান্য লভ্যাংশ দেওয়া কোনো কোম্পানির শেয়ারও যদি মার্জিন সুবিধার আওতায় আসে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি বাড়বে এবং কিছু ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত বাজার আচরণ উৎসাহিত হতে পারে।
নতুন সংশোধনীতে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা খাতের শেয়ারের মার্জিন ঋণযোগ্যতা নির্ধারণের পদ্ধতি পরিবর্তন নিয়ে। বর্তমানে মূল্য-আয় অনুপাতের ভিত্তিতে যে মানদণ্ড রয়েছে, তার পরিবর্তে মূল্য-সম্পদ অনুপাত ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, জীবন বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। তবে সাধারণ বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে মূল্য-আয় অনুপাত ৩০ রাখা বেশি উপযুক্ত বলে তিনি মনে করেন।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, মার্জিন ঋণ ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন হলেও তা এমনভাবে করতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে থাকে। কারণ, অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বিনিয়োগ আবারও বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

